জাপানি শিউলিফুল

একেবারে অবিকল বাংলার শিউলি ফুলের মতো আকৃতি! পাঁচ পাপড়িবিশিষ্ট। যদিওবা শিউলির
মতো সুগন্ধ নেই। কিন্তু হালকা একটা সৌরভ আছে। বাংলার শিউলি ফুলের বোঁটা যেমন কমলা
রঙের হয়ে থাকে এর তা নয়। গাছটি শিউলি গাছের মতো খাড়া নয়, লতার মতো গাছ। দেয়ালেই বেশি
জড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। পলকা শিউলি ফুলের মতো সহজে ঝরে পড়ে না। প্রথম একে আবিষ্কার করি
আমারই বাসার কাছে একটি লোহালক্করের কারখানার লোহার জালির দেয়ালে। অসংখ্য ফুটেছিল আলো
করে। তারপর শহরের আরও অনেক জায়গায় দেখতে পাই। মনে হয় এ ফুলটি বুনো নয়, রীতিমতো রোপন
করে লালন করা হয়ে থাকে।
অপ্রতিদ্বন্দ্বী বোনসাই
জাপানে লিভিং আর্ট তথা জীবন্ত কলাচর্চার মধ্যে ইকেবানা এবং বোনসাই খুবই বিখ্যাত।
জাপানি ঐতিহ্যবাহী টি সিরেমোনি বা চা অনুষ্ঠানের মতো এই দুটোও বহির্বিশ্বে বহু বছর
ধরেই সুপরিচিত। সাম্প্রতিককালে ভারত, বাংলাদেশও ইকেবানা ও বোনসাই সংস্কৃতির চর্চা হচ্ছে
এবং লাভ করছে জনপ্রিয়তা। বাংলাদেশে এমন একজনকে জানি যিনি বোনসাইচর্চা করছেন অনেক বছর
ধরে এবং প্রচুর সুনামও কুড়িয়েছেন। তাঁর নাম কবি হাসান ফিরোজ। কুমিলার এক সময়কার তুখোড়
জনপ্রিয় কবি ও নাট্যকার হাসান ফিরোজ এখন চট্টগ্রামের বাসিন্দা। সেখানেই নির্জন বাসার
ছাদে তিনি গড়ে তুলেছেন তাঁর বোনসাই সাম্রাজ্য।
বোনসাই জাপানে হাজার বছরের উপর চর্চিত হয়ে আসছে। মূলত এটি চীনের সংস্কৃতি
যার নাম পেনজিং। কিন্তু জাপানে এর যে সমাদর এবং শৈল্পিক রূপ আমরা উপভোগ করি
তেমনটি আর কোথাও দেখা যায় না। মাটি বা ধাতব পাত্রে বিভিন্ন শ্রেণীর বৃক্ষকে
দীর্ঘ সময় লাগিয়ে বামুনাকৃতিরূপে লালিত করা হয়। একটি প্রাপ্তবয়স্ক বৃক্ষ ক্ষুদ্রাকৃতি
শিল্প তথা মিনিয়েচারে পরিণত হয় বলেই দেখতে এত সুন্দর এবং নয়নাভিরাম। এর সবচেয়ে
বেশি কদর এবং চর্চার সোনালি যুগ ছিল সামুরাই যুগে প্রায় পাঁচশ বছরকাল। আধুনিককালে
অবশ্য বোনসাইচর্চা বৈচিত্র্যময়তায় আত্মপ্রকাশ করছে তার মাস্টারদের হাতে।
প্রতিবছর গ্রীষ্মকালে সারা জাপান জুড়ে বোনসাই মেলা, প্রদর্শনী এবং প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এই চর্চায় মহিলাদের চেয়ে পুরুষদেরই বেশি দেখা যায়। এটি একটি পুরুষালি সংস্কৃতিচর্চা। এদেশের সরকারি এবং বড় বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথে বড় আকৃতির বোনসাই স্থাপিত আছে। গৃহ ও বাগানসজ্জায় বোনসাই আলাদা এক অভিজাত সৌন্দর্য সৃষ্টি করে বলেই এর জনপ্রিয়তা অনস্বীকার্য। তাই বোনসাই সংস্কৃতিবাণিজ্যেরও একটি অংশ ফলে পণ্যও বটে। কাজেই যত বড় এবং যত নয়নাভিরাম ততই তার মূল্য বেশি এবং ব্যয়বহুল বললে অত্যুক্তি হয় না। যে কারণে বোনসাইপ্রিয় সাধারণ মানুষ ছোট ছোট আকৃতির বোনসাই কিনে গৃহসজ্জায় আলাদা মাত্রা সংযোজন করেন।
বিভিন্ন বৃক্ষের মধ্যে সাৎসুকি বৃক্ষের বোনসাই
খুবই জনপ্রিয়। জাপানে মে মাসের নাম সাৎসুকি, এই মাসেই এই বৃক্ষে হালকা গোলাপি, বেগুনি,
ঘনলাল ফুল ফোটে। অবশ্য সাৎসুকি বৃক্ষের বোনসাইতেও ফোটে। আর যখন এই সাৎসুকি বোনসাইয়ের
মেলা বা প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় ফুলপ্রিয় জাপানিরা হুমড়ি খেয়ে পড়েন।
বোনসাই নিয়ে প্রকাশিত হয়ে আসছে নিয়মিত একাধিক
ম্যাগাজিন, লিখিত হচ্ছে বিস্তর বহুরঙা গ্রন্থ। তাছাড়া প্রতি বছর নববর্ষের ক্যালেন্ডারে
নির্ভুলভাবে উঠে আসে বৈচিত্র্যময় বোনসাই।
চিত্রল চৌচিন থেকে চিতল হরিণীর আলো
জাপানিদের সব কাজের মধ্যেই রয়েছে একটা শৈল্পিক
ছাপ। কবিগুরু জাপানিদেরকে বলেছিলেন শিল্পীর
জাতি। আসলেই যেন তাই। গৃহের অভ্যন্তর থেকে
শুরু করে রাস্তার বেড়া পর্যন্ত
ভোলানো মনোমুগ্ধকর্মের সমাহার। প্রতিটি কাজে সৃজনশীলতার ছাপ না থাকলে যেন চলে
না এই দেশে! যাদের দেখার চোখ আছে তারা ঠিকই সৌন্দর্য উপভোগ করেন।
উয়েনো পার্কের পদ্মফুল
শীতপ্রধান দেশ হলেও জাপানে শাপলা ও পদ্মফুল ফোটে পুকুর ও জলাশয়ে। টোকিওর প্রথম আধুনিক শহর বলে পরিচিত উয়েনো
শহরে জাপানের অন্যতম বড় এবং বিশ্বের ১২তম বৃহৎ উদ্যান যা উয়েনো পার্ক নামে খ্যাত। এই
উদ্যানের মধ্যে রয়েছে চিড়িয়াখানা এবং সংলগ্ন শিনোবাজুইকে নামে একটি বড় জলাশয় কম পক্ষে
কয়েকশ বছরের প্রাচীন। এই জলাশয়েরই সঙ্গে রয়েছে একটি পুকুরও। এখানে রয়েছে বেশ বড় বড়
জাপানি কোই নামে এক প্রকার মাছ যা দেখতে একেবারে বাংলাদেশের রুইমাছের মতো। কিন্তু একেবারে শান্ত এই মাছ মোটেই লাফঝাঁপ
দেয় না। এই জলাশয়ে প্রতি বছর চারদিক আলোকিত করে ফোটে পদ্মফুল। যেমন বড় তেমনি এর রং!
পাতাগুলোও ভীষণ বড় বড়। জুলাই মাস থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত থাকে। সকাল ও বিকেলবেলা
প্রচুর লোকজন এই ফুলের শোভা দেখার জন্য ভিড় করেন। সখের ছবি আঁকিয়েরা তুলি, রঙ আর ইজেল
নিয়ে এসে ছবি আঁকেন। ছবি তোলার জন্য ভিড় করে প্রকৃতিপ্রেমীরা।
পোড়া মাছের সংস্কৃতি 
জাপানি জাতি মূলত সমুদ্রজীবী । সমুদ্রের শ্যাওলা, গুল্ম, শামুক,
উদ্ভিদ, মাছ আর তিমি তাদের ঐতিহ্যবাহী খাদ্য। তবে অত্যন্ত রুচিসম্পন্ন জাপানিদের জীবনযাপন
যে কারণে খাবার-দাবারে সর্বদাই স্বচ্ছ এবং স্বচ্ছন্দ। জাপানিরা প্রতি দিন ভাত ও মাছ
খেয়ে থাকেন। যেমন কাঁচা তেমনি পোড়ামাছ তাদের অত্যন্ত প্রিয়। কাঁচা মাছের সুশি যেমন
সুস্বাদু তেমনি এক ব্যতিক্রমধর্মী খাবার।
Editor : Probir Bikash
Sarker
Powerd by Manchitro Publishers, 2010 Copyright © All Rights Reserved.