বাঙালির মতো জাপানিদেরও তিন বাঙালি ব্যক্তিত্বকে নিয়ে আগ্রহ ও কৌতূহল আদৌ কম নয়। এঁরা হলেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রাজনীতিবিদ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এবং বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। অবশ্য বাংলাদেশে জন্ম বিচারপতি ডঃ রাধাবিনোদ পাল জাপানে সবচেয়ে নমস্য ব্যক্তিত্ব। প্রবীণদের কাছে প্রিয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে নেতাজির বিকল্প নেই বললেই চলে।

তেমনি একজন প্রবীণ ব্যক্তিত্ব ৮৫ বছর বয়সী তেৎসুরো ইয়ামামোতো। ৩৫ ডিগ্রি পর্যন্ত ওঠা  গ্রীষ্মের প্রচন্ড খরতাপকে তুচ্ছ করে বহু দূর থেকে এসেছিলেন নেতাজিকে শ্রদ্ধা জানাতে আগস্ট মাসের ১৮ তারিখে। তাঁর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তাই শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে এসেছিল। দাঁড়িয়ে কথা বলার মতো শক্তি নেই তাঁর শরীরে তথাপি প্রায় ঘন্টাখানেক নেতাজিকে নিয়ে কথা বললেন। মনে হয়  সারাদিন কথা বললেও তিনি ক্লান্ত-শ্রান্ত  হবেন না! এতখানি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা বহন করছেন প্রবীণ জাপানিরা, যাঁরা একদিন নেতাজির সঙ্গে কাজ করেছেন বা সান্নিধ্যে আসার সুযোগ পেয়েছেন।

প্রতি বছর এই দিনে টোকিওর সুগিনামি-ওয়ার্ডের ওয়াদা শহরে অবস্থিত রেনকোজি বৌদ্ধমন্দিরে নেতাজির মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয়ে থাকে। দুপুর  ১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত স্মরণসভায় উপস্থিত থাকেন  নেতাজির প্রায় ৭০ জন জাপানি ও বিদেশী ভক্ত। অধিকাংশই জাপানি, জনা কয়েক ভারতীয় আর বাংলাদেশী দু-একজন। আমার দেখামতে গত দশ বছরেও বাংলাদেশ দূতাবাসের কোন কর্মকর্তা মন্দিরে পা ফেলেননি এই দিবসটিতে। তারা জানেন কিনা সেটাই সন্দেহ জাগায় মনে। তবে প্রতি বছর ভারতীয় দূতাবাস থেকে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা একজন উপস্থিত থাকেন। এবারও এসেছিলেন ডেপুটি চীফ অব মিশন মিঃ সঞ্জয় পান্ডা।

এই স্মরণসভার আয়োজনের প্রথম উদ্যোক্তা ‘নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস একাডেমী-জাপান’ এর প্রতিষ্ঠাতা-কর্মসচিব নেতাজিভক্ত মাসাও হায়াশি। তিনি নেতাজির ভ্রাতুষ্পুত্র অমিয়নাথ বসুর অনুরোধে এই সংস্থাটি স্থাপন করেছিলেন প্রায় শতাধিক নেতাজি ভক্তকে নিয়ে ১৯৫৮ সালে। যাঁদের অধিকাংশই এখন মৃত। ২০০৬ সালে হায়াশিও ইহলোক ত্যাগ করার পর একাডেমীটি  বন্ধ হয়ে যায় ফলে মন্দির কর্তৃপক্ষই  এখন এই সভার আয়োজন করে আসছে।

জানা  যায় যুদ্ধশেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নেতাজির চিতাভস্ম রেনকোজি মন্দিরের তৎকালীন প্রধান পুরোহিত রেভারেন্ড মোচিজুকি গ্রহণ করেছিলেন একদিন ভারতবর্ষ  স্বাধীন হলে  পরে এই পবিত্র চিতাভস্ম তাঁর স্বদেশভূমিতে ফেরত দেবেন বলে। কিন্তু নানা বিতর্ক এবং সন্দেহের কারণে এখনো নেতাজির চিতাভস্ম জন্মভূমি পশ্চিমবঙ্গে ফেরত যায়নি। ৬৫ বছর ধরে তিনি এখনো জাপান প্রবাসী। মাসাও হায়াশি মৃত্যু পর্যন্ত বহু দেনদরবার করা  সত্ত্বেও ফলপ্রসূ হতে পারেননি। নেতাজির কন্যা অনিতা বসু (Anita Bose Pfaff, জন্ম ১৯৪২-) পর্যন্ত  ভারতের  প্রাক্তন কয়েকজন প্রধানমন্ত্রীকে  আবেদন-নিবেদন করেছেন কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

প্রকৃতপক্ষে না হওয়ার কারণ নেতাজির মৃত্যু নিয়ে নানা রকম রহস্য ও জটিলতা। নেতাজির আত্মীয়সহ ভারতীয়রা এখনো মনে করেন নেতাজি ১৮ আগস্ট আদৌ তাইওয়ানে মৃত্যুবরণ করেননি, বরং তিনি আজও এশিয়ার কোথাও না কোথাও পালিয়ে আছেন ১১৩ বছর বয়সে! সত্যিই নেতাজি তাইওয়ানে মৃত্যুবরণ করেছেন কিনা অনুসন্ধান কাজ চালানো হয়েছে তিনবার। সর্বশেষ ২০০২ সালে ভারতের সুপ্রীম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এম কে মুখার্জির নেতৃত্বে অনুসন্ধানী দল তাইওয়ান থেকে রাশিয়া, লন্ডন এবং জাপানেও আসেন কিন্তু বিমান দুর্ঘটনার আলামত খুঁজে  পাননি। শেষ পরীক্ষা  হিসেবে রেনকোজিতে রতি চিতাভস্ম ডিএনএ পরীক্ষার  জন্য চাওয়া হলে মন্দির কর্তৃপক্ষ দেননি   বলে ভারত অ ভিযোগ  করেছে এবং এরপর আর কোন অগ্রগতি  হয়নি। কিন্তু জাপানি ভক্তরা দৃঢ়ভাবেই বিশ্বাস করেন যে, নেতাজি এই তারিখে ভিয়েতনামের রাজধানী  সাইগন  থেকে তাইওয়ানের তাইপে হয়ে রাশিয়া যাওয়ার পথে তাইপের অদূরে মাৎসুয়ামা বিমানবন্দরে এক বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন। নেতাজিকে বহনকৃত একটি জাপানি যুদ্ধবিমান দুর্ঘটনায় পতিত হলে পরে তাঁর সারা শরীর আগুনে ঝলসে যাওয়ার ফলে অজ্ঞান অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন মিলিটারি  হাসপাতালে। যদিওবা তাঁকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করা হয়েছিল বলে নেতাজির ভারতীয় এবং জাপানিদের ভাষ্য থেকে জানা যায়। জাপানি চিকিৎসক ইয়োশিমি তানেয়োশি কর্তৃক নেতাজির মৃত্যু সংক্রান্ত প্রামাণ্য সনদপত্র পর্যন্ত বলছে নেতাজি তাইওয়ানে মারা গিয়েছেন। এই ঘটনার সঙ্গে একটি দুর্ঘটনাজনিত পূর্বাভাস  পাওয়া যায় নেতাজি লিখিত একটি চিরকূটে। ১৯৫৬ সালে গঠিত নেতাজি অনুসন্ধান কমিটিপ্রধান নেতাজি সহযোগী এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের (INA) প্রাক্তন লে.কর্নেল শাহ্ নেওয়াজ খানের কাছে নেতাজির ব্যক্তিগত বিশ্বস্ত সহকর্মী ই.ভাস্করন কর্তৃক হস্তান্তরকৃত  সেই চিরকূটে লেখা ছিল: I am writing this letter, because I am going for a long journey. Who knows I won't get into a plane accident.

আবার অন্যদিকে একাধিক দলিলপত্রের বদৌলতে জানা যায় নেতাজির জীবিত থাকার খবর। যেমন অধ্যাপক.গবেষক পূরবী রায় বলছেন, নেতাজি ইরান হয়ে রাশিয়ায় গিয়েছেন এবং জীবিত  ছিলেন স্টালিনের মৃত্যু পর্যন্ত। স্টালিনের শ্রাদ্ধানুষ্ঠান ধারণকৃত প্রামাণ্যচিত্রে নেতাজিকে উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে বলেও ভিন্নমত রয়েছে। নেতাজি গঠিত ফরোয়ার্ড ব্লকের প্রবীণ নেতারা বলছেন, পূর্ববর্তী রাজনৈতিক মতানৈক্যের কারণে নেতাজি যাতে ভারতে প্রত্যাবর্তন করে ক্ষমতা   দখল করতে না পারেন তার জন্য প্রতিপক্ষ  নেহেরু স্টালিনের মাধ্যমে রাশিয়ায় নেতাজিকে আটকে রেখেছিলেন অথবা হত্যা করিয়েছিলেন। আবার একটি  দুষ্প্রাপ্য  আলোকচিত্র যার তারিখ ২৭ মে ১৯৬৪, নেহেরুর মৃত্যুতে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে নেতাজি  সন্ন্যাসীর বেশে এসেছিলেন--যা পরবর্তীকালে বহুল প্রচারিত রহসম্যয় ‘ভগবানজি’ নামক জনৈক আধ্যাত্মিক শক্তিধারী সন্ন্যাসীর ঘটনাবলিকে স্মরণ করিয়ে দেয়। তাহলে কী নেতাজির তাইওয়ান বিমান দুর্ঘটনা ছিল তাঁরই সাজানো একটি পরিবল্পনা অন্তর্ধান হওয়ার জন্য? নাকি নেহেরুই সাজিয়েছেন এমন নাটক যাতে মানুষ মনে করে নেতাজি মৃত্যুবরণ করেছেন? নেতাজির বিশ্বস্ত সহযোগী হাবিবুর রহমান এবং দুটি অনুসন্ধান কমিটিপ্রধান শাহ্ নেওয়াজ খান এবং জিডি খোশলা কেন মিথ্যে ভাষ্য দিলেন যে নেতাজি তাইওয়ানেই বিমান  দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেছেন--এও এক মহারহস্য! বস্তুত নেতাজির মৃত্যু  বা অন্তর্ধান   সম্পর্কে বহু তথ্য ও রহস্য বিদ্যমান। যার গবেষণা করে শেষ করা যাবে না। তাঁর মৃত্যুর কারণ খোঁজার চেয়ে বরং এই মহান দেশপ্রেমিকের জীবন, কর্ম ও আদর্শ থেকে নতুন এবং অনাগত প্রজন্ম কী শিক্ষালাভ  করতে পারে সেটাই উপলক্ষ হওয়া উচিৎ। 

তাই অধিকাংশ জাপানি এখন আর এই রহস্যময় মৃত্যু নিয়ে কথা বলেন না। তথাপি প্রবীণ ভক্তদের অকাট্য বিশ্বাস: নেতাজি তাইওয়ানেই মৃত্যুবরণ করেছেন এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা যারা প্রাণে বেঁচে গিয়েছেন তাইহোকুতে নেতাজির মরদেহ সৎকার করে জাপানি বৌদ্ধধর্মীয় রীতি অনুযায়ী  কিছু চিতাভস্ম টোকিও পর্যন্ত নিয়ে আসেন।  তখন বিধ্বস্ত টোকিওতে এই চিতাভস্ম সংরক্ষণ  করার মতো কেউ যখন এগিয়ে আসেননি তখন নেতাজিভক্ত রেভারেন্ড মোচিজুকি তা নিয়ে এসে একটি বিশেষ পাত্রে সংরক্ষণ  করেন মন্দিরের দ্বিতলে অবস্থিত মূলবেদির ডানপাশে। আজও সেখানে এই চিতাভস্ম রক্ষিত আছে। প্রতি বছর ১৮ আগস্ট সকলের জন্য মন্দির উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। একবার যদিওবা আগুন লেগে মন্দিরের কিয়োদংশ পুড়ে গেলে চিতাভস্মও বিনষ্ট হয়ে যায় বলে কথিত আছে কিন্তু তার সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। যুদ্ধের পর প্রথম রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্রপ্রসাদ, প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু, কন্যা ইন্দিরা গান্ধী, অটলবিহারী   বাজপেয়ী এখানে  এসে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেন। নেতাজির আত্মীয় অমিয়নাথ বসু, শিশিরকুমার বসু, কৃষ্ণা বসু প্রমুখও এসেছেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর কোন রাজনৈতিক নেতা এই মন্দির পরিদর্শন করেননি এমনকি নেতাজির শেষ অনুসারী বলে কথিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও নন--এটা এক রহস্য। পরবর্তীকালে জিয়াউর রহমান, এরশাদ, খালেদা, শেখ হাসিনা  একাধিকবার জাপানে এলেও কেউ  শ্রদ্ধা নিবেদন   করতে যাননি। কোন রাষ্ট্রদূতও গিয়েছেন কিনা জানা যায় না। আমার জানামতে বাংলাদেশ থেকে কবি নির্মলেন্দু গুণ, সাংবাদিক চিত্ত রিবেরু, কবি সমুদ্র গুপ্ত, এফবিসিসিআই এর প্রাক্তন সহ-সভাপতি দেওয়ান সুলতান আহমেদ, কথাসাহিত্যিক ফখরুজ্জামান চৌধুরী, সাহিত্যিক.অভিনয়শিল্পী দিলারা জামান, লোকসাহিত্য বিশেষজ্ঞ শামসুজ্জামান খান রেনকোজি মন্দিরে  গিয়েছেন নেতাজির আবক্ষ   প্রস্তরমূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। উল্লেখ্য যে, এই মূর্তি স্থাপন করেছেন নেতাজিভক্ত শ্রীমতি এমোরি কিকুকোর কন্যা কাজুকো মাৎসুশিমা ১৯৯৫ সালে নেতাজির পঞ্চাশতম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে  বর্তমানে সত্তোর্ধ এবং প্রতি বছরই উপস্থিত হন স্মরণসভায়। এবারও যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন, নেতাজির দুই দেহরক্ষী  ইয়ামামোতো তেৎসুরু, ইসাও ইয়ামাদা সেইসঙ্গে গবেষক  মোতোইউকি   নেগেশি, গবেষক তোশিআকি ওওৎসুকা, কিয়োদো সংবাদসংস্থার অন্যতম সম্পাদক তাকেজুমি বান, গবেষক ইয়োশিআকি হারা, জাপান-ভারত অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট হিরোশি হিরাবায়াশি ও সিনিয়র ডিরেক্টর ইউজি হারা, রাজনীতিক ও সুগিনামি-ওয়ার্ড পৌর পরিষদ-সদস্যা ইয়োশিকো মাৎসুউরা, নেতাজি গবেষক গেন নাকামুরা প্রমুখ। প্রধান অতিথিদ্বয় ইয়ামামোতো ও ইয়ামাদা নেতাজি সম্পর্কে আবেগ থরোথরো দীর্ঘ স্মৃতিচারণ করেন। কিভাবে জার্মানির ডুবোজাহাজ থেকে জাপানি  ডুবোজাহাজে নেতাজিকে স্থানান্তরিত করা হয় সেই লোমহর্ষক বর্ণনা  দেন! উল্লেখ্য যে, তিন জন দেহরীর একজন শত্রুপক্ষের  গুলিতে নিহত হন। ইয়ামামোতা বিভিন্ন সময়ে সরকারি ও বেসকারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, উপদেষ্টা হিসেবে দেশ-বিদেশে কাজ করেছেন, লিখেছেন ‘কো-রান নো সেকাই’ বা ‘কোরানের জগৎ’ নামে একটি গ্রন্থ। সম্প্রতি     নিজের স্মৃতিকথা গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেছেন সেখানে অনেক অজানা কথা লিখেছেন নেতাজি সম্পর্কে।

প্রতি বছর এখনো নেতাজির জাপানি ভক্ত, সহযোগী ও সহকর্মী যাঁরা জীবিত আছেন তাঁদের স্মৃতিচারণ শুনে মনে হয়: দেশপ্রেমিক নেতাজির  তেজস্বীতার আগুন আজও নেভেনি--আজও তাঁর সেই দীপ্ত-দর্পিত স্বাধীনচেতা  হৃদয়ের উত্তাপ-উষ্ণতা আমাদেরকেও ছুঁয়ে যায়।


Editor : Probir Bikash Sarker
Powerd by Manchitro Publishers, 2010 Copyright © All Rights Reserved.