অনুজপ্রতিম বন্ধু কবি, লেখক, চিত্রশিল্পী এবং বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্রভবন এর সহকারী পরিচালক নীলাঞ্জন যখন ২০০৪ সালে জাপানে এসেছিল তখন বলল, জাপানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী তোজো হিদেকির দৌহিত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চায়। খুবই অবাক হয়েছিলাম তার অনুরোধ শুনে! কারণ তরুণদের তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে চিন্তা করার কথা নয়! কিন্তু ছেলেটি যে শতভাগ জাতীয়তাবোধসম্পন্ন তা তার সঙ্গে আলাপ করার পর বুঝতে পারলাম। জেনারেল তোজো সম্পর্কে তার আগ্রহ আমাকে সত্যি অভিভূত করল। এমনিতেই আমার ইচ্ছে ছিল তোজো হিদেকিকে নিয়ে কিছু লেখার। কিন্তু নানা কাজে ব্যস্ততার জন্য সময় করতে পারছিলাম না। আমি যখন জাপানে আসি তখন বাবা বলেছিল, তিনটি ব্যক্তি সম্পর্কে জাপানে সময় পেলে খোঁজ করো। এঁরা হলেন, বিপ­বী রাস বিহারী বসু, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আর বিচারপতি ডঃ রাধাবিনোদ পাল। তাঁদের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক আছে জাপানের। সেইসব বিস্মৃতপ্রায় ইতিহাস নিয়ে খুব একটা লেখালেখি বাংলা ভাষাতে হয়নি। যদি কখনো সময়-সুযোগ হয় তোমার লেখার চেষ্টা করে দেখতে পারো। লিখে রাখলে ইতিহাসটা থাকবে, ব্যক্তি হয়ত হারিয়ে গেছে, তুমিও হারিয়ে যাবে একদিন কিন্তু তাঁদের নাম, চিন্তা, ভাবনা, কর্মকান্ড অমর হয়ে থাকবে। গ্রন্থ থাকলে কোন না কোন গ্রন্থাগারে সংরতি থাকবেই। সেইসঙ্গে তোমার নামটিও অমরত্ব পাবে কোন সন্দেহ নেই।

পিতৃবাক্য দেববাক্যের সমতুল্য। বাবাকে আশ্বস্ত করে বললাম, একটু আধটু যখন লিখতে পারি তখন চেষ্টা অবশ্যই করব। তবে অ্যাকাডেমিকভাবে গবেষণা করে লিখতে পারব না কারণ সে সময় পাব না। তবে ইতিহাস যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছি তখন অলিখিত ইতিহাস যদি লিখতে পারি সেটা আমারই আনন্দ বৈকি! সম্প্রতি গৌতম বুদ্ধের ওপর ‘মহাপরিনির্বাণের কথা’ নামক দীর্ঘ প্রবন্ধটি সাপ্তাহিক স্বদেশ কাগজে প্রকাশিত হলে পরে দেখলাম প্রচুর লোক পড়েছে। বেশ সাড়া পড়েছে। খুব উৎসাহবোধ করছি। আশা করি একদিন তোমার আশা পূরণ করতে পারব। আশীর্বাদ করো।

আমাদের বাসায় একটি মাঝারি আকৃতির ইংরেজি বই ছিল টোকিও মিলিটারি ট্রাইবুনাল নিয়ে লিখিত কোন এক ইংরেজ ভদ্রলোকের, গ্রন্থ এবং লেখকের নাম মনে নেই। বাবা সেটি দিয়ে বলল, এটা পড়ে দ্যাখো।

বইটি পড়েছিলাম, সেখানে প্রথম জেনারেল তোজো হিদেকি এবং বিচারপতি রাধাবিনোদ পালের নাম জেনেছিলাম। এই বিচারে জেনারেল তোজোর ফাঁসি হয়েছিল তথাকথিত যুদ্ধাপরাধের কারণে। বিচারপতি পালের নাম স্মরণে ছিল। জাপানে এসে যখন মানচিত্র প্রকাশ করেছিলাম তাতে তখন ‘জাপানে বাঙালি’ শিরোনামে একটি ধারাবাহিক প্রবন্ধে তাঁর সম্পর্কে কিছু তথ্য তুলে ধরেছিলাম। বাবা সেটি পড়ে সন্তুষ্ট হয়নি। বিস্তারিত জানার তাঁর আগ্রহ। কিন্তু তখন এত ব্যস্ত ছিলাম চাকরি, সংসার ও মানচিত্র নিয়ে যে অন্যদিকে ঘাড় ফেরানোর সুযোগ ছিল না। কিন্তু মনে মনে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম তথ্য সংগ্রহ করব এবং লিখব। তবে সব তথ্যের উৎসই কঠিন জাপানি ভাষাজাত। শ্রদ্ধেয় রবীন্দ্রগবেষক, অধ্যাপক কাজুও আজুমা স্যারকে এই ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে বললেন, সবই তো জাপানি ভাষাতে লিখিত, বিস্তর তথ্য-উপাত্ত, গ্রন্থাদি আছে। পড়ে গবেষণা করতে হবে অনেক সময় লাগবে। তবে আপনার স্ত্রী যখন জাপানি তিনি আপনাকে সাহায্য করতে পারেন। আমি ব্যস্ত যদিওবা তবুও সহযোগিতা করব কথা দিচ্ছি আপনি একটু একটু করে এগিয়ে যান। আপনিই একমাত্র ব্যক্তি যে এইসব ইতিহাস নিয়ে কাজ করতে পারবেন, আর কাউকে তো দেখতে পাচ্ছি না। না জাপানি, না বাঙালি।

গুরুজন ও আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং প্রতিবেশী আজুমাস্যার আর আমার স্ত্রী নোরিকো মিয়াজাওয়া এই দুজনের সহযোগিতা নিয়ে একটু একটু করে বই সংগ্রহ করে পড়তে এবং নোট করতে লাগলাম। দুএকটি প্রবন্ধ লিখে মানচিত্রেও প্রকাশ করলাম। পূর্ণাঙ্গভাবে লেখার সময় এলো ২০০৫ সালের পর। ২০০২ সালে মানচিত্র কাগজটি বন্ধ হয়ে গেল। চাকরির ব্যস্ততাও কিছুটা কমিয়ে আনলাম। সময় বের করে পড়তে লাগলাম বিভিন্ন গ্রন্থাগার ও জাপানি বন্ধুদের কাছ থেকে গ্রন্থ, সাময়িকী, পত্রিকা ইত্যাদি এনে। কিন্তু বড্ড কঠিন এবং পুরনো কানজিতে লিখিত বলে হাড় ভেঙ্গে যাবার উপক্রম হল। তথাপি পরিশ্রমসাধ্য কয়েকটি প্রবন্ধ লিখতে সম হলাম। বিপ­বী রাস বিহারী বসু, নেতাজি সুভাষ বসু, রাধাবিনোদ পাল সম্পর্কে। রাধাবিনোদ পালের রচনাটি অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক বিচিত্রা কাগজে প্রকাশিত হয়েছিল। বাকি দুটো আমার লিখিত ‘জানা অজানা জাপান’ প্রবন্ধ সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করেছি।

তাঁদের নিয়ে যখন গবেষণা করছিলাম তখন বিস্তর তথ্যের সন্ধান পেলাম রবীন্দ্রনাথ ও জাপান সম্পর্কে। আজুমাস্যার  বললেন, গুরুদেব পাঁচবার জাপান এসেছিলেন ১৯১৬ সাল থেকে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত। জাপানি পন্ডিত ওকাকুরা তেনশিন ছিলেন তাঁর বন্ধু। আজুমাস্যারের বাসায় এই বিষয়ে প্রচুর গ্রন্থ এবং তথ্যাদি দেখে মাথাই ঘুরে গেল! আরে এ যে আরেক খনির সন্ধান পেয়ে গেলাম! অবিশ্বাস্য! অবিশ্বাস্য! কিছু বইপত্র পড়ে ওকাকুরা তেনশিন, রবীন্দ্র-জাপান সম্পর্ক নিয়েও কয়েকটি প্রবন্ধ লিখে ফেললাম। স্যারকে পড়ে শোনালাম তিনি খুবই খুশি হলেন। এই সবই ‘জানা অজানা জাপান’ দুখন্ডে অন্তর্ভুক্ত করেছি। বই দুটো যারাই পড়েছেন বললেন, এত বিস্তৃতভাবে এর আগে কেউ এসব বিস্মৃত ইতিহাস লিখেননি। তবে প্রবন্ধগুলোতে ধারাবাহিকতা নেই। বিচ্ছিন্নভাবেই লিখিত। কিন্তু আরও তথ্য বেরিয়ে আসছে যতই দিন যাচ্ছে। সেগুলো ভবিষ্যতে সংযুক্ত করার ইচ্ছে।

এই চারজন বাঙালিকে নিয়ে লিখলেও তোজো হিদেকি নিয়ে লেখার তাড়নাটা সবসময়ই অনুভব করছিলাম। কিন্তু সময় পাচ্ছিলাম না। জাপান, ভারত ও বাংলাদেশে যে তথ্য পেয়েছি তা নিয়ে লিখলেই যথেষ্ট। আমি তো পিএইচডি করতে যাচ্ছি না, নিজের ও আমার বাবার কৌতূহল মিটলেই যথেষ্ট। ২০০৭-৮ সালের মাঝামাঝি একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখে শেষ করলাম তোজোকে নিয়ে। মাসিক দশদিক কাগজে ধারাবাহিক প্রকাশিত হল। তারপর ‘জানা অজানা জাপান’ গ্রন্থের দ্বিতীয় খন্ডে অন্তর্ভুক্ত করলাম। বইটি অনুজপ্রতিম বন্ধু মোঃ জসীম উদ্দীনের উদ্যোগে জাপান প্রবাসী বাংলাদেশী বন্ধুরা চাঁদা দিয়ে স্মারকগ্রন্থ হিসেবে প্রকাশ করল মানচিত্র পাবলিশার্স থেকে। বইটি নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেছেন কবি ডঃ মাহবুব হাসান দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায়। তোজো হিদেকি নিয়ে লিখিত প্রবন্ধটির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

প্রকৃতপক্ষে হয়ত আরও কিছু দিন দীর্ঘায়িত হত লেখাটি লিখতে গিয়ে। কিন্তু নীলাঞ্জনের আগ্রহ আমাকে অস্থির করে তুলল। এর আগে ২০০০ সালের কোন সময় বন্ধুবর রফিকুল আলম আমাকে বিস্মিত করে খবর দিল: একজন ভদ্রমহিলা আপনার সঙ্গে আলাপ করতে আগ্রহী। তাঁকে আমি আপনার জাপান-বাংলা সম্পর্ক নিয়ে কাজ করার কথা বলেছি। এও বলেছি আপনি জেনারেল তোজো হিদেকিকে নিয়ে লেখার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একদিন চলুন পরিচয় করিয়ে দিই।

রফিকের কথা শুনে মনে মনে বিস্মিত না হয়ে উপায় ছিল না। কারণ একে তো প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর নাতনি তার ওপর তিনি নিজেও খ্যাতিমান মহিলা। পত্রপত্রিকাতে ছবি দেখেছি এবং সাক্ষাৎকার পড়েছি। তিনি তাঁর ঠার্কুদা তোজোকে নিয়ে গবেষণা করছেন। আমার মতো সাধারণ একজন বিদেশী শ্রমিকের সঙ্গে কী তাঁর আলাপ হতে পারে! কিন্তু ঠিক ঠিকই রফিক একদিন তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল তাঁর অফিসে নিয়ে গিয়ে। সাক্ষাতে বুঝতে কষ্ট হল না শুধু পরিচ্ছদেই নয় মধ্যপঞ্চাশ-পেরনো ভদ্রমহিলা আপাদমস্তক যে আসলেই অভিজাত এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। টোকিওর অভিজাত আওয়ামা ইচ্চোওমে শহরে অবস্থিত তাঁর ছোট্ট অফিসে দেখলাম বিচারপতি রাধাবিনোদ পালের একটি বড় ছবি টেবিলের ওপরে রাখা। তোজো হিদেকির ছবিও আছে। নেইমকার্ড বিনিময় করলাম। জাপানির উল্টো পীঠে ইংরেজিতেও লেখা আছে, ইউকো তোজো। লেখিকা এবং পরিবেশ সংরণ একটি এনপিও’র প্রেসিডেন্ট। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি আমাকে আপন করে নিলেন। জাপানি ভাষা জানার ফলে সম্পর্কটা দ্রুত বন্ধুত্বে পরিণত হয়ে গেল। এই বন্ধুত্ব এখনো অটুট। আমার স্ত্রীর সঙ্গেও একাধিকবার আলাপ হয়েছে। এমন সংবেদনশীল মহিলা খুব কমই দেখেছি এই জীবনে। পরবর্তীকালে যখন তোজো হিদেকি সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য পড়েছি তখন অনুভব করেছি জেনারেল তোজো সামুরাই বংশোদ্ভূত সেনাকর্মকর্তা হলেও বড়ই সংবেদনশীল মানুষ ছিলেন তার ছাপ তাঁর নাতনির চরিত্রে খুবই সুস্পষ্ট। যুদ্ধের পর একমাত্র চীনা ও রাশিয়াদ্বারা প্রভাবিত বামপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি এবং পত্রিকাগুলোর অপপ্রচারের কারণে তাঁকে অহেতুক হেয় প্রতিপন্ন করা হয়েছে। তাঁর চরিত্রের ওপর কালিমা লেপন করেছে মার্কিনী প্রভাবে। অনেকটা বঙ্গবন্ধুর জীবনের সঙ্গে তোজোর জীবনের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। অথচ জেনারেল তোজো হিদেকির মতো জনদরদী দেশপ্রেমিক এবং সম্রাটের প্রতি অনুগত রাষ্ট্রনায়ক আর দ্বিতীয় কাউকে খুঁজে পাওয়া কঠিন। যদি বামপন্থী রাজনীতিক, শিক, লেখক, সাংবাদিক আর পত্রিকাগুলো তোজোর পাবলম্বন করত তাহলে টোকিও ট্রাইবুনালে তোজো হিদেকিই জয়লাভ করতেন নিঃসন্দেহে। জাপানের ইতিহাস অন্যরকম হত। আজকে জাপানকে আমেরিকার একপ্রকার উপনিবেশে পরিণত হতে হত না। এর জন্য তোজো হিদেকি মোটেই দায়ী নয়, যেমন দায়ী সাইয়োকু বা বামপন্থীরা। প্রকৃতপক্ষে সম্রাটীয় শাসনব্যবস্থাকে গ্রহণ করতে না পারার ব্যর্থতা পক্ষান্তরে আমেরিকার উপনিবেশে পরিণত করতে সাহায্য করেছে জাপানকে। কাজেই এদেরকে দেশবিরোধী বললে অত্যুক্তি হয় না। এরা আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ  ঘোষণা করে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জাপানকে জড়িয়ে ফেলেছে বলে যে তোজোর বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে আজও--তার কোনও ভিত্তিই নেই! জাপানকে যে গভীর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছে আমেরিকা ও বৃটেন তা বোঝার মতো মেধা এদের কারো আছে বলে আমার মনে হয়নি। এটা দৃঢ়তার সঙ্গেই মনে হয়েছে যেসব গ্রন্থ পড়ে এবং বিভিন্ন গবেষকের সঙ্গে আলোচনা করে যে অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে তৎকালীন জাপান এবং প্রধানমন্ত্রী তোজো হিদেকি সম্পর্কে তার আলোকে। এসব আমি যতখানি সম্ভব নিজ বুদ্ধি-বিবেচনার সঙ্গে লিখেছি: জাপানের শেষ সামুরাই তোজো হিদেকি প্রবন্ধে। ইউকো তোজো বেশ কিছু গ্রন্থের নাম লিখে দিয়েছিলেন যেগুলো পড়ে বিস্ময়ের কোন সীমারেখা ছিল না আমার! কী গভীর গভীর ষড়যন্ত্র জাপানের অভ্যন্তরে এবং বহির্বিশ্বে তখন হয়েছে, যেখানে প্রভাবশালী জাপানিরাও জড়িত ছিলেন। তোজো হিদেকি ছিলেন স্রেফ বলির পাঁঠা।

কাজেই যখন নীলাঞ্জনের মুখে তোজো হিদেকির প্রশংসা শুনলাম তখন একটা ধাক্কা খেয়ে আর কালবিলম্ব না করে তোজোকে নিয়ে লিখতে বসলাম। ২০০৪ সালের গ্রীষ্মকালই হবে। নীলাঞ্জনকে নিয়ে গেলাম তোজোসানের অফিসে এক অপরাহ্নে। তার আগে তাঁকে জানিয়েছিলাম, তিনি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়েছিলেন সাক্ষাৎ দেবার জন্য। নীলাঞ্জন ক্যামেরা ও নোটবুক নিয়েছিল। প্রায় তিনঘন্টাব্যাপী আমরা আলাপ করলাম। একসময় আবেগপ্রবণ হয়ে তোজোসান ফাইল খুলে ঠার্কুদার অনেক দুর্লভ আলোকচিত্র ও পোস্টকার্ড টেবিলে রাখলেন। একটি পেনডোরার বা· উন্মুক্ত করে দিলেন আরকি! হুমড়ি খেয়ে পড়লাম দুজনই। নীলাঞ্জন ডিজিটাল ক্যামেরা দিয়ে সবগুলোকে ল্যান্সে তুলে নিল। যা জানার তা জেনে তাঁকে প্রণাম জানালাম। তারপর একটি স্মারক ছবি তুলে দিলাম দুজনের, সে রবীন্দ্রনাথের একটি আলোকচিত্র বড় করে নিয়ে গিয়েছিল উপহার দেবার জন্য। সেটা পেয়ে তিনি খুব খুশি হলেন। বললেন, টেগোর তাঁর খুব প্রিয়। তাঁর সঙ্গে জাপানের খুব গভীর সম্পর্ক ছিল।

পরে নীলাঞ্জন আমাকে ছবিগুলোর কপি পাঠিয়েছিল। এই পোস্টকার্ডগুলো ছিল তোজো যখন তরুণ বয়সে জার্মানিতে মিলিটারি এটাচি হিসেবে কর্মরত ছিলেন তখন নিয়মিত পরিবারকে পাঠিয়েছেন। পরিবার সম্পর্কে তাঁর ছিল অসম্ভব টান। উচ্চাদর্শ, খুবই খুঁতখুঁতে স্বভাবের এবং মিতব্যয়ী মানুষ ছিলেন তোজো। অধীনস্তদের প্রতি ছিলেন বারবরই সংবেদনশীল। প্রতিটি কাজের ক্ষেত্রেই মেমো লিখে রাখার অভ্যেস ছিল তাঁর। চীনের মাঞ্চুরিয়াতে একবার যুদ্ধক্ষেত্রে বিধ্বস্ত মন্দিরের ধ্বংসস্তুপে একটি ক্ষুদ্র বৌদ্ধমূর্তি দেখতে পেয়ে সেটাকে সত্ত্বেও সংগ্রহ করার জন্য অধীনস্তকে আদেশ দিয়েছিলেন। এবং সেটা যথাযথভাবে সংরতি হয়েওছিল। সময় পেলেই তিনি জনগণের জীবনযাপন পর্যবেণ করতেন। প্রাতভ্রমণে বেরিয়ে উদ্যানে কর্মরতা মালিনীকে নিজের মাথার টুপি নামিয়ে কুর্নিশ করে কুশলাদি জিজ্ঞেস করতে দ্বিধান্বিত হতেন না। শিশুদের তিনি অত্যন্ত ভালোবাসতেন। সেই মানুষটা চীনের নানকিং শহরে লক্ষ লক্ষ লোককে হত্যা করার আদেশ দেবেন তাঁর সেনাবাহিনীকে ভাবাই কঠিন! গণহত্যা যে প্রকৃতপে জাপানি রাজকীয় সেনাবাহিনী নয়--চীনা দস্যু বর্বর যাযাবর গোত্রের সেনাসদৃশ সন্ত্রাসীরা সংঘটিত করেছে তার বহু প্রমাণ আবিষ্কার করেছেন জাপানি গবেষকরা, এখনো অব্যাহত আছে। শুধু তাই নয়, কোন কোন চীনা বংশোদ্ভূত গবেষক পর্যন্ত বলছেন যে নানকিং-এ গণহত্যার নামে যা হয়েছে সবই চীন-আমেরিকার ষড়যন্ত্র--মানুষ হত্যাসংক্রান্ত যে সকল আলোকচিত্রাদি অপপ্রচারে ব্যবহৃত হয়েছে অধিকাংশই নকল না হয় জাপানি সেনাবাহিনীর পোশাকধারী চীনাদের। কারণ চীনা ও জাপানিদের চোহারা আলাদা করার উপায় নেই। বরং জাপানি সৈন্যরা স্থানীয় নাগরিকদেরকে বহিরাগত দস্যুদের হাত থেকে বাঁচানোর সর্বাত্মক চেষ্টা করেছে, নগরবাসীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে কথা বলছে সেনারা এমন ছবিও গৃহীত হয়েছে তৎকালীন জাপানি যুদ্ধ-সাংবাদিকদের ক্যামেরায়, প্রকাশিতও হয়েছে দৈনিক পত্রিকা এবং সাময়িকীগুলোতে। তবে যেহেতু সেটা ছিল চীন ও জাপানের মধ্যে যুদ্ধ কিছু সাধারণ নাগরিক তো খুন বা মারা যেতেও পারে। সেটাই তো স্বাভাবিক। যুদ্ধের পর টোকিও মিলিটারি ট্রাইবুনালে নানকিং ম্যাচাকারের আলামত গৃহীত হয়নি। এমনকি সত্তরের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই নিয়ে চীন ও জাপানের মধ্যে কোন বাদপ্রতিবাদ ওঠেনি, উঠেছে পরে এবং তার জন্য বামঘেঁষা  দৈনিক আসাহিশিম্বুন পত্রিকাকে দায়ী করেছেন জাতীয়তাবাদী রাজনীতিক, গবেষক এবং পত্রিকাগুলো।

তবে একদিন যে সময় আসবে জেনারেল তোজো হিদেকিকে মূল্যায়নের তাতে কোন সন্দেহ দেখি না। আজকে নতুন নতুন তথ্য ও গ্রন্থাটি প্রকাশিত হচ্ছে তাতে দেখা যাচ্ছে যে, মিত্রশক্তির ষড়যন্ত্রের কথা তোজো বা সম্রাট জানতেন না। বরং তোজো যে সম্রাটকে বাঁচিয়ে দিয়ে গেছেন এবং প্রায় চার বছরকাল ভয়াবহ যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন অসীম সাহস এবং বুদ্ধিবলে তা স্বীকার না করে উপায় নেই।

সেদিন ফিরে আসতে আসতে নীলাঞ্জন বলল, প্রবীরদা, আমি একটি দৃশ্য ভুলতে পারি না। সেটি হল: ট্রাইবুনালে যখন তোজোকে ফাঁসির রায় ঘোষণা করল বিচারক তখন তিনি কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মৃদু মাথা নেড়ে যে বীরত্বের সঙ্গে রায় মাথায় তুলে নিলেন--এর সত্যি তুলনা হয় না। আসলে তোজো ছিলেন তখনকার বিশ্বের সকল মিলিটারি জেনারেলদের মধ্যে সবচেয়ে ভদ্র, সংবেদনশীল এবং বীরোচিত ব্যক্তিত্বের অধিকারী--এটা আমার বিশ্বাস। যে কারণে মৃত্যুকে আদৌ ভয় করেননি তিনি। সেনা তো জীবন দেবার জন্য। কিন্তু তারপরও সম্রাট, দেশপ্রেম আর নিজের আত্মসম্মানকে সর্বদাই ঊর্ধ্বে তুলে রেখেছিলেন তোজো এমনটি সচরাচর দেখা যায় না।

নীলাঞ্জনের এই মূল্যায়নের কথা আমি তোজাসানকে বলেছিলাম, তিনি অত্যন্ত খুশি হয়েছিলেন। আমাকে বললেন, একবার আমাকে নিয়ে চলো নেতাজি আর বিচারপতি পালের জন্মস্থানে। আমি নীলাঞ্জনকে সে কথা জানালে সে আজুমাস্যারকে অনুরোধ করে স্যারের সঙ্গে কলকাতায় যাওয়ার ব্যবস্থা করে পরের বছরই। কলকাতার এলগিন রোডে যেখানে নেতাজির বাড়ি এখন জাদুঘর সেখানে গিয়েছিলেন তোজোসান। নেতাজির আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে আলাপ করেছেন। একদল জাপানি নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি সঙ্গে করে। শুনেছি সাকুরা টিভি চ্যানেল নামে এটি সংস্থার সাংবাদিকরাও ছিলেন। তাঁর বহুদিনের একটি স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে। এবার বাকি রইল বিচারপতি রাধাবিনোদ পালের জন্মভূমি বাংলাদেশের কুষ্টিয়াতে যাওয়ার। সেই মাটিকে একবার প্রণাম করতে চান তিনি কারণ টোকিও ট্রাইবুনালে ১১ জন বিচারপতির মধ্যে একমাত্র আইনজ্ঞ ডঃ পালই সেই বিচারকে আমলে নেননি এবং অভিযুক্ত সকলকে নির্দোষ বলে রায় প্রদান করে বিশ্বইতিহাস সৃষ্টি করেন। তোজোর পরিবারের সঙ্গেও বিচারপতি পালের পরবর্তীকালে গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। বিচারপতি পালের ছেলে প্রশান্তকুমার পাল সস্ত্রীক ১৯৯৭ সালে জাপানে এসেছিলেন কিয়োতো শহরে ডঃ পালের একটি স্মৃতিফলক স্থাপন অনুষ্ঠানে যোগাদান করার জন্য আমন্ত্রিত হয়ে তখন তোজোসানের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে। 


Editor : Probir Bikash Sarker
Powerd by Manchitro Publishers, 2010 Copyright c All Rights Reserved.