জাপানের রাজধানী আধুনিক টোকিওর একটি ব্যস্ত স্টেশনের নাম নিপ্পোরি। এখানে জাপান রেলওয়ে এবং কেইসেই রেলওয়ে ট্রেন থামে। মূলত কেইসেই রেলওয়ের স্টেশনই বলা চলে একে। কারণ এই স্টেশন থেকে জাপানের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নারিতা যেতে হয়। নারিতা যেতে হলে কেইসেই লাইনই প্রধান। প্রতিদিন প্রচুর দেশি-বিদেশী কেইসেই লাইন কোম্পানির রেল চড়ে যাতায়াত করেন। এই জন্য নিপ্পোরি খুব বিখ্যাত স্টেশন এবং শহর।

তবে নিপ্পোরি একটি উপশহর। নিপ্পোরির পরেই রয়েছে জাপানের প্রথম আধুনিক শহর উয়েনো। এটি টোকিওর প্রধান বড় শহরগুলোর একটি। এখানেই জাপানের প্রথম জাতীয় জাদুঘর, জাতীয় বিজ্ঞান জাদুঘর, দেশী ও বিদেশী শিল্পকলা জাদুঘর, আন্তর্জাতিক শিশু গ্রন্থাগার, জাতীয় চারুকলা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। টোকিওর বিখ্যাত বড় উদ্যানগুলোর মধ্যে উয়েনো উদ্যান অন্যতম এবং বিশ্বের ১২তম বৃহৎ উদ্যান। এই উদ্যান নয়নাভিরাম সাকুরা উৎসবের জন্য ইতিহাসখ্যাত।  

উদ্যানসংলগ্ন শিনোবাজুইকে নামক স্থানে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম জাপান ভ্রমণের সময় ১৯১৬ সালে তাঁর জাপানি বন্ধু জাতীয় চিত্রশিল্পী তাইকান য়োকোয়ামার বাড়িতে আতিথেয়তা গ্রহণ করেছিলেন। শিল্পী তাইকানের বাড়িটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অগ্নিদগ্ধ হয়। যুদ্ধের পর নতুন করে একতলাবিশিষ্ট বাড়ি নির্মাণ করা হলে এখানেই বাকি জীবন কাটান। মৃত্যুর পর বাড়িটিকে তাঁর স্মৃতিজাদুঘর হিসেবে গড়ে তোলা হয়। এখানে সাজিয়ে রাখা হয়েছে পরম যত্নসহকারে শিল্পীর বিখ্যাত কিছু চিত্রকর্ম এবং ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিসপত্র। তাঁর প্রিয় বৈঠকঘরটি তেমনি আছে যা সত্যিই দেখার এবং অবসরকে উপভোগ করার মতো। এই কক্ষে ঐতিহ্যবাহী চা-অনুষ্ঠান চাদোও অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে মাঝেমধ্যে। দেয়ালে লাগানো আছে শিল্পীর বিখ্যাত চিত্রকর্ম কোন একদিন প্রশান্ত মহাসাগর। ধোঁয়ার মতো সাদা কুন্ডুলি পাকিয়ে কিছু উঠে আসছে তীব্র বেগে সমুদ্রবক্ষ থেকে--এমন সূক্ষ্মরেখার টানে চিত্রিত একটি শক্তিশালী কাজ যে বিস্ময়ের উদ্রেক করে বৈ কি! চিত্রটি তিনি পাঁচবার এঁকেছিলেন তারপরও সন্তুষ্ট হতে পারেননি। এটি এঁকেছিলেন যুদ্ধের পর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত, বিধ্বস্ত জাপানের পুনরায় উত্থানের আকাংখার কথা ভেবেই এটি এঁকেছিলেন বলে ডঃ নাগানো আমাকে বলেছিলেন। প্রচন্ড জাতীয়তাবাদী ছিলেন তাইকান তেমনি ছিলেন আন্তর্জাতিকতাবাদী। একেবারে তাঁর গুরু শিল্পাচার্য পন্ডিত তেনশিন ওকাকুরার মতো। ডঃ নাগাওর সঙ্গে আলোচনাকালে তিনি জানান, কলকাতা থেকে ফিরে তাইকান আমেরিকা সফলে গেলে মার্কিনীদের আচরণ এবং রুচিহীন জীবনযাপন দেখে এতই বিরক্ত হন যে, সেখান থেকে প্রেরিত একটি পোস্টকার্ডে লিখেছিলেন: আমেরিকা ভদ্রলোকের দেশ নয়, এটা শুয়রের দেশ! ডঃ নাগাও সেই পোস্টকার্ডটির কপি দিয়েছিলেন আমাকে এবং বলেছিলেন এই বিষয়টি জাপানিরা জানে না বললেই চলে। কোথাও প্রকাশিত হয়নি আজ পর্যন্ত। এই আমেরিকার ইমিগ্রেশনেই কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পাসপোর্ট হারিয়ে ফেলার কারণে অপদস্ত হয়েছিলেন ১৯২৯ সালে একজন নোবেল বিজয়ী সত্ত্বেও! 

এই পর্যন্ত কয়েকবার জাদুঘরে গিয়েছি, এর কিউরেটর ছিলেন ডঃ নাগাও মাসানোরি নামে এক প্রবীণ ভদ্রলোক। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম অনেক আগে একবার এবং আমার সম্পাদিত কাগজ মানচিত্রে প্রকাশ করেছিলাম। তাঁর মৃত্যুর পর তাইকানের পালকপুত্র তাকাশি তাইকান জাদুঘরের প্রধান কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তাঁরও একবার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি ২০০৪ সালে সেটি দৈনিক প্রথম আলোরর সাহিত্য পাতায় প্রকাশিত হয়েছিল বাইশে শ্রাবণ উপলক্ষে।

এই নিপ্পোরি শহরে আছে ইয়ানাকা নামে একটি সুবিখ্যাত পাড়া। এখানে এদো (১৬০৩-১৮৬৮), মেইজি (১৮৬৮-১৯১২) তাইশো (১৯১২-২৬) এবং শোওয়া যুগের (১৯২৬-৮৯) প্রথম ভাগের পুরনো গৃহাদি, ঐতিহ্যবাহী খাদ্য ও পণ্যসামগ্রীর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, মন্দির, উদ্যান, বাজার প্রভৃতি রয়েছে। আধুনিক দোকানপাট তো আছেই। সারাবছরই এখানে উৎসব, মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদি লেগেই থাকে। লোকে-লোকারণ্য থাকে সাপ্তাহিক ছুটির দিন শনি ও রবিবার এবং জাতীয় ছুটির দিনগুলোতে। দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন বেড়াতে আসেন। এই পাড়ার ভিতর দিয়েই নানা রকম দোকানপাট ঘুরে ঘুরে দেখতে দেখতে চলে যাওয়া যায় উয়েনো একেবারে জাতীয় চারুকলা বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উদ্যান এবং উদ্যানসংলগ্ন বিখ্যাত কানয়েইজি বৌদ্ধমন্দির পর্যন্ত। এই মন্দিরেই প্রথম সফরের সময় কবিগুরুকে এক বিরাট সংবর্ধনা দিয়েছিলেন ৩০০ বিশিষ্ট জাপানি। উদ্যান থেকে নিচের দিকে গেলেই তাইকান স্মৃতিজাদুঘর। উল্লেখ্য যে, উয়েনোর জাতীয় চারুকলা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সঙ্গে প্রথম থেকেই জড়িত ছিলেন তাইকানের গুরু তেনশিন ওকাকুরা। পরে এর আচার্যও নিযুক্ত হয়েছিলেন তেনশিন কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে একটি বিব্রতকর পরিস্থিতির কারণে আচার্যপদ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন এবং বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন স্থান ইয়ানাকাতে প্রতিষ্ঠা করেন জাপান চারুকলা ইনস্টিটিউট তাঁর শিষ্য চিত্রশিল্পী তাইকান, শুনসো হিশিদা, কানজান শিমোমুরা, কোগেৎসু সাইগো, বুজান কিমুরা প্রমুখকে নিয়ে। এঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন জাপানের অসাধারণ প্রতিভাবান চিত্রশিল্পী। এঁদের মধ্যে তাইকান ও কানজান ১৯০৩ সালে কলকাতার জোড়াসাঁকোস্থ ঠাকুর পরিবারে কয়েক মাস ছিলেন দুদেশের সাংস্কৃতিক বিনিময়কে জোরদার করার লক্ষ্যে অবশ্য গুরু তেনশিনের প্রভাবে, তখন দুজন রবিঠাকুর, অননীন্দ্রনাথ, গগেন্দ্রনাথ, নন্দলাল বসু প্রমুখের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। ইয়ানাকাতে আচার্য তেনশিনের একটি ছোট্ট স্মৃতিউদ্যানও রয়েছে। প্রবীণ জাপানিরা এই উদ্যানটি দেখার জন্য হেঁটে আসেন তারপর চলে যান চারুকলা বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে তাইকান স্মৃতি জাদুঘর পর্যন্ত।

বাঙালিরা ঘুরতে আসেন জাপানে কিন্তু রবীন্দ্র স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো সম্পর্কে জানেন না একেবারেই। ২০০৮ সালে জাপানে এসেছিলেন বিদগ্ধ কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক ফখরুজ্জামান চৌধুরী এবং জননন্দিত গল্পকার ও অভিনয়শিল্পী দিলারা জামান। ব্যক্তিগত জীবনে তাঁরা স্বামী স্ত্রী। তাঁদেরকে নিয়ে এক অপরাহ্নে তাইকান স্মৃতিজাদুঘরে গিয়েছিলাম কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেদিন সেটি বন্ধ ছিল। ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁদের স্মারক আলোকচিত্র ক্যামেরায় ধারণ করেছিলাম। ইচ্ছে ছিল তাঁদেরকে ঘুরিয়ে দেখাব সংস্কৃতির শহর উয়েনো এবং ইয়ানাকা কিন্তু হৃদরোগের মানুষ জামানভাই হাঁটতে পারেন না যে কারণে রাজি হলেন না, যদিও ইচ্ছে ছিল তাঁরও।

নিপ্পোরি শহর আমার বাসা থেকে ট্রেনে মাত্র ১০ মিনিটের দূরত্বে। টোকিও ঘুরতে হলে এই নিপ্পোরি হয়েই যেতে হয়। মাঝেমাঝে ইচ্ছে করেই ক্যামেরা পকেটে নিয়ে বেরিয়ে পড়ি টোকিওর এখানে সেখানে। কত বিচিত্র, পুরনো ও নতুন জিনিসের সন্ধান যে মেলে এই ৪০০ বছর প্রাচীন মহানগরটির অলিগলিতে বলে শেষ করা যাবে না! ইয়ানাকা আমার প্রিয় স্থান। তাই সেদিনও বিকেলবেলা ইয়ানাকা দিয়ে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছিলাম। একটি বেশ পুরনো ঐতিহ্যবাহী সুশি খাবারের দোকানের সামনে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়তে হল। এর আগে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। দোকানের শোকেসে সাজিয়ে রাখা হয়েছে কিছু মাটি ও প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি পুতুল পুতুল চমৎকার ছোট্ট ছোট্ট মূর্তি। আহামরি না হলেও দেখতে দারুণ তা স্বীকার করতে হবে। আর এত প্রাণবন্ত যে নিথর স্বরহীন বলে মনেই হয় না! একেই বলে শিল্পীর জাদুকরী সৃষ্টি। সচেতন যে কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করবে এই মূর্তিগুলো।

জাপানিরা অতিসূক্ষ্ম, ক্ষুদ্র এবং নয়নাভিরাম মিনিয়েচার সৃজনকর্মে সত্যিই সুদক্ষ। কবিগুরু জাপানি শিল্পকলা দ্বারা প্রভূত প্রভাবিত হয়েছিলেন সম্ভবত এই কারণেই। 







Editor : Probir Bikash Sarker
Powerd by Manchitro Publishers, 2010 Copyright © All Rights Reserved.