বাংলাসাহিত্য এবং বাঙালি জাতির জীবনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরই আপন আলোকে উদ্ভাসিত যে কবি তিনি চিরবিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। এ বছর তাঁর ১১২তম জন্মজয়ন্তী। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত নজরুল একাডেমী এবং জাতীয় নজরুল সমাজ যৌথভাবে সারাদেশব্যাপী কবির জন্মদিবস উদযাপন উপলক্ষে নানা রকম অনুষ্ঠানের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। নিঃসন্দেহে একটি উত্তম পরিকল্পনা। আর তারই প্রথম অনুষ্ঠানটির উদ্বোধন হল কুমিল্লা দিয়ে। কারণ কবি দীর্ঘদিন ত্রিপুরা তথা কুমিল্লা জেলায় ছিলেন। শহরের ঠাকুরপাড়াস্থ জনৈকা প্রমীলা দেবীকে বিয়েও করেছেন। উপশহরে অবস্থিত দৌলতপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে নার্গিসকেও ভালোবেসেছিলেন। নার্গিসকে নিয়ে গানও রচনা করেছেন। শহরের তালপুকুরপাড়ে সময় কাটিয়েছেন। একে নিয়ে ছড়াগানও লিখেছেন। স্বদেশী আন্দোলনে নিবেদিতপ্রাণ ও প্রতিনিয়ত যোদ্ধা নজরুল ইসলাম এই শহরেই ইংরেজের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার কারণে গ্রেপ্তার হয়ে ভারতে চলে যেতে বাধ্য হন। কবির সঙ্গে কুমিল্লার তাই আত্মিক সম্পর্ক। এই জন্য কুমিল্লাকে বেছে নেয়া হয়েছে এই শুভসূচনা হিসেবে এই মহাপরিকল্পনায়।

কিন্তু যা আশা করা গিয়েছিল ১২ তারিখে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে তা আদৌ পাওয়া যায়নি। যেমন জমকালো এবং আনন্দঘন একটি আলোচনা ও সাংস্কৃতিক করা সম্ভব ছিল তা করা যায়নি। এর জন্য অনান্তরিকতাকেই দায়ী করা চলে। আন্তরিকতা যেখানে থাকে না সেখানে দায়িত্বজ্ঞানের কোনো বালাইও থাকে না। অথচ অনুষ্ঠানটি জাতীয় এবং সরকারি পর্যায়ের। বলতে বাধ্য যে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দায়সারাগোছের একটি অনুষ্ঠান করে দায়িত্ব এড়িয়ে গেছে। যা আদৌ কাম্য ছিল না। উল্লেখ্য যে, রবীন্দ্র সার্ধজন্মবর্ষের স্মারক অনুষ্ঠানেও দর্শকের সংখ্যা ছিল অপ্রতুল।

অনুষ্ঠানের জন্য পর্যাপ্ত প্রচারও করা হয়নি। ফলে বিশ জনের বেশি দর্শক ছিল না বললেই চলে। জেলা পরিষদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠানে যাদের অতিথি হয়ে আসার কথা ছিল তাদের মধ্যে স্থানীয় সাংসদকে দেখা যায়নি, দেখা যায়নি পদাধিকারবলে উপস্থিত হতে জেলা প্রশাসককে। সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে যে, কবির দৌহিত্রী সকলের অত্যন্ত প্রিয়মুখ খিলখিল কাজী এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন এটা শহরবাসীর জানাই ছিল না! অত্যন্ত বিব্রতকর অবস্থার মধ্য দিয়ে তিনি অনুষ্ঠানটি করে গেছেন। যা কবি ও কবিদৌহিত্রীকে অপদস্ত করার শামিল বললে আদৌ মিথ্যে বলা হবে না। দর্শকের অভাবে অনুষ্ঠানটি শুরু হয় দীর্ঘ দু'ঘণ্টা পর! নয়টার আগেই তাড়াহুড়ো করে অত্যন্ত অগোছালোভাবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ছিল বড্ড পীড়াদায়ক। নতুন কিছু উপহার দেয়া তো দূরের কথা, যে কুমিল্লা সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান তীর্থস্থান তার ঐতিহ্যগত কোনো প্রতিফলনই উপস্থাপিত হল না মঞ্চে এই দুঃখ নিয়ে মিলনায়তন থেকে বেরিয়ে আসতে হল।

রবীন্দ্রনাথের মতো কবি নজরুলও বাঙালির অবহেলার শিকার হয়ে চলেছেন, এই অবক্ষয়ের ধারা কোথায় গিয়ে থামে কে জানে? গলাবাজির সংগঠন করে বাঙালির মহান ব্যক্তিদেরকে এভাবেই হেয় করে চলেছে কতিপয় সংস্কৃতিবিরোধী মানুষ যাদেরকে এখনই প্রতিরোধ না করলে হাজার বছরের বাঙালি সভ্যতা-সংস্কৃতি হারিয়ে যেতে যেতে বন্যউলম্ফন ছাড়া আর কিছুই থাকবে না।


Editor : Probir Bikash Sarker
Powerd by Manchitro Publishers, 2011 Copyright © All Rights Reserved.