সামুরাই সংস্কৃতি ও রবীন্দ্রনাথ

প্রবীর বিকাশ সরকার

 

জাপানের ইতিহাস বলে অতীতেও একাধিকবার প্রাকৃতিক এবং মানবসৃষ্ট মহাদুর্যোগের কবলে পড়েছে সে, প্রভূত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিন্তু আবার দাঁড়িয়ে গেছে। যেভাবেই দাঁড়াক, সেখানে প্রধান চালিকাশক্তি ছিল জাতিটির আত্মিক বল অর্থাৎ সামুরাই শক্তি। 

স্মরণকালের মধ্যে সম্পূর্ণ ধ্বংসযজ্ঞ থেকে জাপান পুনরায় উঠে দাঁড়িয়েছে ১৯২৩ সালে কানতোও দাইশিনসাই বা মহাকানতোও ভূমিকম্পের পরে। ম্যাগনিচ্যুড ৭.৯ ছিল ভূকম্পনের মাত্রা তাতে করে টোকিও ও ইয়োকোহামায় জানমালের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি সাধিত হয় ১ লক্ষ ৫ হাজারের বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির কথা আমরা অনেকেই জানি। এক রাতেই আমেরিকার চিরুণী বোমাবর্ষণে ১ ল মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। পুড়ে অঙ্গার হয়ে যায় পুরো রাজধানী। আবার আমেরিকারই নিক্ষেপিতদুদুটো   আণবিক বোমার আঘাতে হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে লক্ষ লক্ষ আবালবৃদ্ধবনিতা পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ১৯৯৫ সালে হানশিন-আওয়াজিমা দাইশিনসাই বা সংক্ষেপে দক্ষিণহিয়োগো মহাভূমিকম্প হয় যার মাত্রা ছিল ৭.৩ ম্যাগনিচ্যুড। তাতে সাড়ে পাঁচ হাজার নাগরিক মৃত্যুবরণ করেন। এসব ছাড়াও ১৯৪৪, ১৯৪৬ এবং ১৯৪৮ সালেও বেশ বড় মাপের ভূমিকম্পের কারণে বহু জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মহাযুদ্ধের প্রভাবে সেসব ভূমিকম্পের সংবাদ খুব একটা প্রচার পায়নি। এইসব দুর্যোগ জাপানিরা মোকাবেলা করেছে ঐক্যবদ্ধভাবে। এই ঐকবদ্ধতার নামই স্বদেশ প্রেম অর্থাৎ সামুরাই শক্তি। তাই জাপানি জাতি কোনো বিপর্যয়েই ভীত হয় না, সন্ত্রস্তও নয়। অবিচল থেকে ঘটনা বোঝার চেষ্টা করে।

আমরা যদি আরও অনেক আগের দিকে পেছন ফিরে তাকাই দেখি যে, জাপানিদের দেশপ্রেম যা এক আত্মিকশক্তিরই নামান্তর তার বড় প্রমাণ এদোযুগে (১৬০৩-১৮৬৮) অর্থাৎ সামুরাই-যোদ্ধাদের যুগে, যখন জাপান দু’শ বছরের জন্য তার ভৌগলিক মানচিত্রকে বিদেশিদের সংস্পর্শ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল; একেবারেই বলা যায় নিষিদ্ধ রাজ্যে পরিণত করেছিল। এমন ঘটনা তৎকালীন সময়ে বিশ্বের আর কোথাও ছিল কি? কেন সেটা করেছিল প্রভূত শক্তিশালী সামরিক তোকুগাওয়া ইয়েয়াসু সরকার? মূলত নির্ভেজাল স্বদেশেপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে আত্মবলে বলীয়ান একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনের লক্ষ্যেই এটা করা হয়েছিল। এবং তাতে করে শোওগুন  তোকুগাওয়া সফল হয়েছিলেন। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত থাকা পারস্পরিক যুদ্ধমান জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। সেই যে জাপানিরা ঐক্যের মাধ্যমে সমগোত্রীয় হল তারপর রাজনীতির খাতিরে ভিন্নমতামত, মতভেদ, ভিন্নমতাদর্শ যা-ই তাদের মধ্যে থাকুক না কেন, আজও স্বদেশপ্রেম ও জাতির উন্নয়নে  একমত এবং ঐক্যবদ্ধ। এই ক্ষেত্রে তারা আপোষ করতে রাজি নয়। তাদের আত্মমর্যাদাবোধ আর দেশপ্রেম সমার্থক। তাই দেখা যায়, অতীতে জাপানি সামুরাইরা যেমন দুর্ধর্ষ যোদ্ধা মোঙ্গলদের একাধিক আক্রমণ প্রতিহত করেছিল তেমনি প্রভাবশালী চীনা কুইং সাম্রাজ্যকেও যুদ্ধে পরাজিত করেছিল (১৮৯৪-৯৫)। তখনই এই যুদ্ধ বিশ্বের অনেক জাতি বিশেষ করে শ্বেতাঙ্গ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে নাড়া দিয়েছিল। এরপর রুশ-জাপান যুদ্ধে (১৯০৪-৫) ক্ষুদ্র একটি সাম্রাজ্য জাপানের ব্যাপক বিজয় এশিয়ায় দখলদার সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বৃটিশ, ফ্রান্স, স্পেইন, ওলন্দাজদেরকে ভ্রুকুঁচকাতে বাধ্য করেছিল। বলা হচ্ছে এই যুদ্ধটি ছিল জেরো ওয়ার্ল্ড ওয়ার বা শূন্য বিশ্বযুদ্ধ। আর তাতে জয়ী হয়েছে এশিয়ার উদীয়মান শক্তি জাপান, তার প্রতিক্ষপ  ছিল উদীয়মান শ্বেতাঙ্গ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি রাশিয়া। রাশিয়ার বিরুদ্ধে এই বিপুল বিজয়ের অন্তরালে  কাজ করেছে জাপানিদের আত্মিকশক্তিতে    বলীয়ান ঐক্য এবং ধৈর্যশীল দেশপ্রেম। এশিয়ার রাজনীতিবিদরা তো বটেই, বৃটিশ পদানত অনৈক্য ভারতবর্ষের প্রথম প্রতিবাদী বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ভীষণ আন্দোলিত হয়েছিলেন। চট্টগ্রামে গিয়ে এক সমাবেশে জাপানের বিজয়কে নির্দেশ করে বাঙালিকে জেগে ওঠার জন্য আহবান জানিয়েছিলেন। কিন্তু তার আগেই কবি স্বামী বিবেকানন্দর কাছ থেকে, ১৯০২ সালে কলকাতায় ভ্রমণকালে স্বনামধন্য জাপানি জাতীয়তাবাদী পন্ডিত তেনশিন ওকাকুরার কাছ থেকেও জাপানি আত্মিকশক্তির কিছু পরিচয় পেয়েছিলেন। তখন থেকেই তাঁর আগ্রহ বৃদ্ধি পেতে থাকে একদা তাঁরই ভাষায় বর্ণিত ‘বর্বর’ জাপান দেশটির প্রতি।

সেই রবীন্দ্রনাথ জাপানের প্রতি তথা জাপানিদের উন্নত রুচিবোধ, সৌন্দর্যজ্ঞান, নীতিধর্ম, শ্রমলদ্ধ সাধনা, প্রকৃতিবন্দনা এবং শিল্পচর্চার প্রতি কী পরিমাণ আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিলেন প্রথমবার এসে ১৯১৬ সালে তার বর্ণনা আমরা পাই তাঁরই রচিত ‘জাপানযাত্রী’ ভ্রমণলিপিতে। সেই বর্ণনা থেকে সহজেই অনুভব করা যায় উপরোক্ত গুণাগুণগুলো জাপানিদের আত্মিকশক্তি নিয়ন্ত্রিত স্বদেশপ্রেমজাত। এগুলো খাঁটি এবং অবশ্য জগৎখ্যাত জাপানি জাতীয়তাবাদী সংস্কৃতির ভিত্তি। এই একই জাতীয়তাবাদে রবীন্দ্রনাথ নিজেও কৈশোর থেকেই ছিলেন উদ্বেলিত। কলকাতাভিত্তিক বাংলার সাংস্কৃতিক নবজাগরণ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। পরবর্তীকালে অবশ্য হিন্দু ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের উত্থানের ফলে তিনি সেপথ-মত পরিত্যাগ করেন প্রকাশ্যে কিন্তু অন্তরপ্রদেশে এমন এক জাতীয়তাবোধকে লালন করতে শুরু করেন মনীষী ওকাকুরার সঙ্গে সাক্ষাতের  পর থেকে যার মধ্যে জাপানি ‘বুশিদোও’ তথা সামুরাই-যোদ্ধা শ্রেণীর রীতিনীতি-পথ-মত-আদর্শাশ্রিত জাতীয়তাবোধেরই অনুরণন ছিল। অবশ্য সামুরাইদের এই জাতীয়তাবোধ অতিমাত্রায় প্রকাশ ঘটেছিল রাজনীতিবিদ এবং রাজকীয় সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে যাঁদের অধিকাংশই ছিলেন সামুরাই বংশোদ্ভূত বা সামুরাই জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ।

বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্ন থেকেই বিশ্বব্যাপী জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটছিল সাম্রাজ্যবাদ শাসিত অঞ্চলসমূহে। ভারতবর্ষও তার ব্যতিক্রম ছিল না। জাপানে জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটেছিল মূলত স্বদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা  কিংবা বিদেশি শক্তিকে প্রতিহত করার জন্য। বিশেষ করে পার্শ্ববর্তী দুটি শক্তিশালী সাম্রাজ্য চীন ও রাশিয়া সম্পর্কে জাপান ছিল বরাবরই উদ্বিগ্ন, অস্থির। কাজেই অস্তিত্ব রার্থে জাপানকেও রুশ-জাপান যুদ্ধের কয়েক বছর পরেই সাম্রাজ্যবাদী হতে হয়েছিল, অবিভক্ত কোরিয়াকে ১৯১০ সালে অঙ্গীভূত করতে হয়েছিল, তাইওয়ান দ্বীপ, ওকিনাওয়া দ্বীপকেও নিজস্ব অঞ্চলে সংযুক্ত করতে হয়েছিল চারদিকে একটা নিরাপত্তা বেস্টনি তৈরির লক্ষ্যে  আরও পরে চীনের মাঞ্চুরিয়া প্রদেশকেও দখলে আনতে হয়েছে। অবশ্য সেসব অঞ্চলে প্রাকৃতিক সম্পদশূন্য জাপানের ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যও ছিল অন্যতম প্রধান তবে আঞ্চলিক সৌভাতৃত্ব এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নমূলক। তৎকালীন সামুরাই বংশোদ্ভূত রাজকীয় সেনা বাহিনীর দায়িত্বশীল উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা খুব ভালো করেই জানতেন যে, দখলকৃত উপনিবেশগুলোকে উন্নত করতে না পারলে নিজেদের অস্তিত্বই একদিন বিপন্ন হবে, এশিয়ায় বহিরাগত শক্তি বৃটিশ, ওলন্দাজ আর ফরাসীরা জাপানকেই আক্রমণ করবে। বহিরাগত সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ভয়েই সামুরাইরা বাধ্য হয়েছিল নিষিদ্ধ জাপানের দ্বার উন্মুক্ত করার জন্য। সুতরাং জাপান উপনিবেশগুলোতে জাপানি সংস্কৃতিই শুধু নয়, স্থানীয় ভাষা, ঐতিহ্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতিকেও সমানভাবে উন্নত করতে স্বতঃর্স্ফূতভাবে আগ্রহী ছিল এবং উদ্যোগ নিয়েছিল। সেই আধুনিক ভিত্তির উপরেই গড়ে উঠেছে আজকের দণি কোরিয়া, উত্তর কোরিয়া, তাইওয়ান, হংকং, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং চীন। সেই তুলনায় বৃটিশ, ফরাসী, স্পেইন, পর্তুগীজরা দু’শ বছরের শাসনে কতখানি উন্নতি সাধন করেছে ভারতবর্ষে বা অবিভক্ত বাংলা অঞ্চলে তা আমরা সকলেই জানি। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তা ভালো করে জানতেন বলেই তাঁর শান্তিনিকেতনের মাধ্যমে স্বদেশ-উন্নয়নের চিন্তা করেছিলেন। এর জন্য নির্ভর হয়েছিলেন জাপানিদের আত্মিক শক্তিজাত রীতিনীতি ও সংস্কৃতির ওপর। যাকে এখানে বলা যেতে সামুরাই সংস্কৃতি। যেগুলোর আদিউৎস চীন কিন্তু স্বাতন্ত্র্যতায় সমৃদ্ধ হয়েছিল, শ্রীবৃদ্ধি পেয়েছিল জাপানি সামুরাই শ্রেণীর পৃষ্ঠপোষকতায়। সেই ইতিহাস অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল এবং চলে আসছে সেই ১৩ শতক থেকে সামুরাই ত্রিয় যোদ্ধা শ্রেণীর যখন জন্ম হয় কামাকুরা যুগে (১১৮৫-১৩৩৩)।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জাপানিদের আত্মিক সৌন্দর্যের প্রতীক জুউদোও (জুজুৎসু), ইকেবানা, টি সিরেমনি বা চাদোও, ঐতিহ্যবাহী কলাচিত্র বা নিহোনগা, তেইএন বা বাগানচর্চা, দারুশিল্প তো বটেই প্রকৃতি ও মানুষের আচার-ব্যবহারে আকৃষ্ট হয়েছিলেন বলেই পাঁচ-পাঁচবার জাপান ভ্রমণ করেছিলেন। এতবার আর কোনো দেশে যাননি। এগুলোকে শান্তিনিকেতনের বিদ্যালয়ে প্রচলিত করার প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন, জাপান থেকে প্রশিকও আমন্ত্রিত করে এনেছিলেন কিন্তু সফলকাম হতে পারেননি। তাঁর জীবিতকালেই এই উদ্যোগ মিয়ম্রাণ হয়ে পড়েছিল। এর পেছনে বাঙালির অবহেলা আর বৃটিশদের ষড়যন্ত্র ছিল বলে অনেকের বিশ্বাস। বাঙালির অবয়, ক্রময় দেখে রবীন্দ্রনাথ বড়ই মনোকষ্টে উচ্চারণ করেছিলেন, ‘সাত কোটি সন্তানেরে কে মুগ্ধ জননী রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করোনি!’ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর এই কথাটি শুনতে পাই একজন প্রসিদ্ধ জাপানি রবীন্দ্রগবেষকের মুখে।।

কেন রবীন্দ্রনাথ জাপানি সংস্কৃতির প্রতি এত বিমুগ্ধ ছিলেন তার প্রধান কারণই ছিল বাঙালি তথা ভারতবাসীকে আত্মিকশক্তিতে বলীয়ান করার জন্য। যে জাতির আত্মিকশক্তি, আত্মমর্যাদাবোধ, রুচিশীলতা যত বেশি সমৃদ্ধ হবে তার সংস্কৃতির ছায়া তার উপর পড়তে বাধ্য। বুশি বা সামুরাইদের প্রতিদিনকার জীবনযাত্রার অনুষঙ্গ ছিল এই সৌন্দর্যচর্চা। এই সংস্কৃতি তারা উপনিবেশগুলোতেও লালন করেছেন, শিখিয়েছেন স্থানীয়দের। বলাই বাহুল্য, সামুরাইদের রুচিবোধ ও নীতিজ্ঞান (বুশিদোও=সামুরাই প্রথা) ছিল অত্যন্ত উচ্চমার্গের যা এশিয়ার আর কোনো সংস্কৃতিতে খুঁজে পাওয়া যায় না। রবীন্দ্রনাথ কী পান্তরে শান্তিনিকেতনে বুশিদোও প্রথাই চালু করে ভারতবাসীকে সামুরাই না হোক আত্মিকভাবে শক্তিশালী হয়ে বহিরাগত সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য তৈরি করতে চেয়েছিলেন? আগেই বলেছি, জাপান সাম্রাজ্যের রাজকীয় সেনা বাহিনীর অধিকাংশ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাই ছিলেন সামুরাই বংশোদ্ভূত। বিশেষ করে মেইজি মহাসংস্কারের (১৮৬৮) কাল থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত শুধু রাজকীয় বাহিনীর কর্মকর্তাই নন, স্বনামধন্য চিন্তাবিদ, পন্ডিত, রাজনীতিবিদ,    শিক্ষাবিদ,  শিল্পী, ভাস্কর, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ, মহাজন, পুরোহিত, ধর্মীয় নেতা প্রায় সবাই ছিলেন সামুরাই বংশের লোক। এখনো তাঁদের বংশধররা ধর্ম, চিন্তা, রাজনীতি, শিক্ষা  ও বাণিজ্য ক্ষেত্রে সক্রিয়।

রবীন্দ্রনাথ এই সামুরাইদের সমরবাদের যেমন কঠোর সমালোচনা করেছিলেন তেমনি সামুরাই বংশধর সংস্কৃতিজনদের সঙ্গেই গড়ে উঠেছিল তাঁর অসামান্য বন্ধুত্ব। যেমন প্রভাবশালী পন্ডিত তেনশিন ওকাকুরা, চিত্রশিল্পী তাইকান ইয়োকোয়ামা, শিল্পপতি এইইচি শিবুসাওয়া, চিন্তাবিদ মিৎসুরু তোয়ামা, রাষ্ট্রনায়ক শিগেনোবু ওওকুমা প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। তাছাড়া তাঁর সঙ্গে আরও সে সকল ব্যক্তিত্বের সখ্যতা হয়েছিল তাদের অধিকাংশই ছিলেন জাপানি জাতীয়তাবাদী ভাবাদর্শের অনুসারী তবে তাঁরা আন্তর্জাতিকতাবাদেও ছিলেন শ্রদ্ধাশীল ও অনুরাগী। কেউ ুদ্রমনা ছিলেন না। উপনিবেশগুলোতে যুদ্ধচলাকালীন কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া সাধারণ মানুষের ওপর রাজকীয় সেনাবাহিনীর অত্যাচার, অনাচার কিংবা হত্যাকান্ডের কোনো প্রমাণ গবেষকরা খুঁজে পাননি। যে সকল তথ্য, কাহিনী চীনে ও কোরিয়ায় প্রচারিত হয়েছে সবই ভিত্তিহীন প্রচারণা এবং অতিরঞ্জিত করেছে স্থানীয় ইতিহাস লেখকরা বলে জাপানি গবেষকদের সাম্প্রতিক গ্রন্থাদি থেকে জানা যায়। অবশ্য পাশ্চাত্য গবেষকদের গ্রন্থাদিতেও কোনো গণহত্যার প্রমাণ পরিলতি হয় না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চীনে জাপানি রাজকীয় বাহিনীর দ্বারা অহেতুক অত্যাচার ও গণনিধনের যে কঠোর সমালোচনা করেছিলেন তা সবই ছিল প্রচারণাদ্বারা প্রভাবিত। শান্তিনিকেতনে অবস্থানরত চীনা পন্ডিত ও ছাত্রদের দ্বারাও তাঁর কান ভারী করা হয়েছিল বলে কোনো কোনো গবেষক মনে করেন। বিশ্বযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর কাছে জাপানের পরাজয় ঘটলে পরে দুর্বল হয়ে পড়া জাপানের পে সত্যিকার ইতিহাস তুলে ধরা সম হয়নি আমোরিকার প্রবল চাপে। বহু জাপানি গ্রন্থ মিত্রশক্তি প্রধান আমেরিকা কর্তৃক ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে যেখানে রাজকীয় সেনাবাহিনী প্রকৃতই কী করেছে চীনের মাঞ্চুরিয়াতে, কোরিয়ায়, তাইওয়ানে, হংকঙে, বার্মা বা ইন্দোনেশিয়াতে তার বর্ণনা ছিল। যেগুলো সেসব অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নের চিত্রাটি বর্ণিত প্রামাণ্য গ্রন্থ যা মার্কিন ও বৃটিশদের বিপে অবস্থান গ্রহণের জন্য ছিল যথেষ্ট শক্তিশালী। সেইসব দুষ্প্রাপ্য  গ্রন্থগুলো দেশ-বিদেশ থেকে সংগ্রহ করে একদল জাতীয়তাবাদী ইতিহাস গবেষক এখন পুনর্মুদ্রণের কাজ করছেন। কিছু কিছু প্রকাশিতও হচ্ছে যেখানে সত্যিকার ঘটনা জাপানি ও বিদেশিদের অন্ধদৃষ্টিকে   খুলে দিতে সহায়ক হচ্ছে। এইসব গ্রন্থগুলো ইংরেজিতে অনূদিত হলে পরে সুদীর্ঘকালের পাথরচাপা অন্ধকার মুছে যেতে সময় লাগবে না, প্রকৃতপে ‘সামুরাই সেইশিন রিয়োকু’ বা ‘বীরযোদ্ধাদের আত্মিকশক্তি’তে আপ্লুত রাজকীয় সেনা বাহিনীর কর্মকর্তাদের প্রতি যে অহেতুক, পরিকল্পিত এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কলঙ্ক লেপন করা হয়েছে বিগত অর্ধ শতাব্দী ধরে তা মিথ্যে প্রমাণিত হত। 

রবীন্দ্রনাথ সমরবাদকে ঘৃণা করতেন আবার বিপ্লবী সমরবাদকে আমলও দিতেন। বাংলার স্বদেশী বিপ্লবের জন্মই হয়েছিল তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়িতে, ওকাকুরার পরোক্ষ প্রভাবে। তিনি ইতালির স্বৈরাচারী সামরিক জান্তা মুসোলিনীর সঙ্গে করমর্দন যেমন করেছেন আবার জাপানে তাঁর উদ্দেশে প্রদত্ত সংবর্ধনা সভায় সামুরাই বংশোদ্ভূত প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, সামরিক কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। রাশিয়ায় জারের আমলে, মহামতি লেলিনের আমলে ল ল ইহুদিকে হত্যা করা হয়েছে তার কোনো প্রতিবাদ করেননি বা লিখেননি রবীন্দ্রনাথ। চীনা সমরবাদের অত্যাচার, অনাচার সম্পর্কেও কিছু লিখেছিলেন কী? সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে যে, ‘চীনা ভবনে’র মতো যে নিপ্পন ভবন’ বা ‘জাপান ভবন’ কবিগুরুর আরাধ্য ছিল শান্তিনিকেতনে গড়ে তোলার জন্য তার মূলে ছিল জাপানি ভাষা ও সংস্কৃতি-শিক্ষা  ভাষার সঙ্গে সংস্কৃতির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। নিপ্পন ভবনে ভাষাসহ সংস্কৃতি শিক্ষাদানের  পাঠক্রমও অন্তর্ভুক্ত থাকার কথা। ১৯৯৪ সালে যাঁরা কবিগুরুর স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করেছেন তাঁরা সামুরাই বংশোদ্ভূত না হলেও ‘বুশিদোও সেইশিন’ বা ‘বীরব্রতের আত্মিকশক্তি’ দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। উদ্বোধনকালে চাদোও, ইকেবানার অনুষ্ঠান হয়েছিল জাঁকজমকরূপে। এসব চর্চা ছাড়া শুধু জাপানি ভাষা শিখে জাপানিদের মনমানসিকতাকে বোঝা এক কথায় কঠিন। জাপানি কোম্পানিতে চাকরি করা যাবে কিন্তু জাপানিদের মন জয় করা যাবে না। জাপানি সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক ছিলেন সামুরাইরা আগেই বলেছি, যারা জেন্ (ধ্যান) বৌদ্ধধর্মেরও প্রধান পরিপোষক ছিলেন। তাঁদের আমলে জেন্ বৌদ্ধধর্ম বিগত ৬০০ বছরে অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন করে, ছড়িয়ে পড়ে বহির্বিশ্বে। আর জীবন্ত জেন্কলাই হচ্ছে সামুরাইদের সংস্কৃতি: চাদোও, ইকেবানা, নোহ্, কাদোও (সুগন্ধ উপভোগ সমাবেশ), জুউদোও, কারাতে, কেনদোও (লাঠিক্রীড়া), লিপিকলা (রবীন্দ্রনাথ খুব প্রভাবিত হয়েছিলেন), সুইবোকুগা (ধূসরঙের চিত্রাঙ্কন পদ্ধতি), বোনসাই, তেইএন, হাইকু, কাদান তথা ওয়াকা, তানকা প্রভৃতি কাব্যচর্চা ইত্যাদি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জাপানি সমরবাদকে দেখেছেন কিন্তু জাপানি সংস্কৃতির প্রধান পৃষ্ঠপোষকদের দেখেননি। আজকে বলা প্রয়োজন যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন জাপানের সংসদ কার্যকর ছিল, সামরিক সরকার থাকা সত্ত্বেও ‘গণতান্ত্রিক’চর্চাও করেছেন সমরবাদীরা। সংসদে তুমুল বাকবিকন্ডা পর্যন্ত হয়েছে বিভিন্ন দলের সাংসদদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সমস্যাদি নিয়ে  এমন ঘটনা সমরবাদ নিয়ন্ত্রিত আর কোনো রাষ্ট্রে ছিল না তখন। বিদেশি গবেষকরাও তা স্বীকার করেছেন।

তথাপি, জাপানি সামুরাই আর সাম্রাজ্যবাদ এক না হলেও জাপানি রাজকীয় বাহিনীর আত্মিকশক্তিটাই ছিল সামুরাই রক্তজাত। বহু সামরিক ব্যক্তির জীবনাচার ও কর্মকান্ডে এর পরিচয় বিধৃত। সামুরাই জীবনাচার ও সংস্কৃতিচর্চা থেকে আমরা বাঙালিরা অনেক কিছু শিক্ষালাভ  করতে পারি। যা রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে প্রচলন করতে চেয়েছিলেন। যে সংস্কৃতি বহন করছেন প্রতিটি জাপানি। জাপানিরা যেমন ঐক্যবদ্ধ জাতি তেমনি একলা চলতেও তারা অভ্যস্ত। সামুরাইশক্তি দ্বারা তারা সুপরিচালিত। তাই এবারের এত বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগেও তারা ভীত নয় বরং সামুরাইশক্তির বলে সকল প্রতিবন্ধকতা উৎরে যানে তারা। সেইসঙ্গে এ বছর কবিগুরুর সার্ধশতজন্মবর্ষে এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগ সতেত্বও কবিকে স্মরণ করছেন অনেক জাপানি নাগরিক বিবিধ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। তাদের ভাষ্য: আমাদেরকে সামুরাই সংস্কৃতিতেই ফিরতে হবে কেননা সেখানে রয়েছে প্রকৃতি, মাটি এবং মানুষ।



Editor : Probir Bikash Sarker
Powerd by Manchitro Publishers, 2011 Copyright © All Rights Reserved.