ছোটবেলা থেকে যৌবনপ্রাপ্তি পর্যন্ত আমার সময় কাটে পুরান ঢাকার নারিন্দা শরৎ গুপ্ত রোড মহল্লায়। কৈশোরে একদিন গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায় বেড়াতে যাই। আমার মা ফুল খুব ভালোবাসতেন। মাকে একদিন ফুল তুলতে সাহায্য করতে গিয়ে কেঁদে ফেললাম। মা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কাঁদছ কেন! কী হয়েছে?

আমি কাঁদতে কাঁদতে জবাব দিলাম, আমার মনে হয় জীবন্ত অবস্থায় আমার সমাধি ঘটবে! আমি জানি না আমার কেন এমন মনে হয়!

মা শুনে বললেন, বালাই ষাট। এসব তোমার নিছক দুশ্চিন্তা। এসব চিন্তা করো না, সব ঠিক হয়ে যাবে।

কিন্তু আমার শ্রদ্ধেয়া নানীজান আমার জন্য অনেক দুশ্চিন্তা করতেন।

শুধু তাই নয়, ঝড় এলে বা খুব প্রবল বেগে বৃষ্টি শুরু হলে আমার ভয় হত এই বুঝি বজ্রপাতে আমি মারা যাব!

অনেক সময় মনে হত যদি কোনদিন দেশে খাদ্যাভাব বা দুর্ভি দেখা দেয় তাহলে আমি না খেতে পেয়ে মারা যাব! ১৯৭৪ সালে যখন দেশে তীব্র খাদ্যসংকট দেখা দিল তখন অনেক সম্পদের অধিকারী মানুষকেও না বিপদে পড়তে দেখেছি। দুর্ভি এমন এক মহামারি যে ধনী-গরীব কাউকে ছেড়ে দেয় না। গরীব মানুষকে তো চোখের সামনেই কঙ্কালসার হয়ে মারা যেতে দেখেছি।

একবার আমার চেয়ে বয়সে বড় জ্যাঠাতভাই বলল, তোমার দুটো কান কেটে দেব। তখন তোমার মাথার টুপি তুলে ফেললে সবাই দেখবে কানবিহীন তুমি। মেয়েরা দেখে  হেসে কুটি কুটি হবে। বেশ হবে। 

কথাটি যে সে দুষ্টুমি করে বলেছিল সেটা বুঝতে পারিনি, সত্যি বলে ধরে নিয়েছিলাম। সন্তস্ত্র ছিলাম কান নিয়ে। ভয়ও পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম যদি কান না থাকার কারণে কোন মেয়ে আমার সঙ্গে বিয়ে বসতে রাজি না হয়, তাহলে কী হবে? এ রকম নানা দুশ্চিন্তা এবং ভয়-শঙ্কা আমার ছেলেবেলাটাকে শাসন করত। কিন্তু বড় হয়ে দেখলাম সেসবের শতকরা শতভাগই ঘটেনি আমার জীবনে। এসব দুর্ভাবনা ছিল নিতান্তই নিছক বা বালসুলভ। ছেলেবেলায় অনেকেরই এরকম ভাবনা হয় বলে এখন বুঝতে পারছি। যেমন বজ্রপাত সম্পর্কে ভয় পেতাম অথচ সেই বজ্রপাতের আঘাতে মৃত্যু ঘটে সাড়ে তিন লক্ষ ভাগের এক ভাগ। স্বাভাবিকভাবে জীবন্ত কবর হওয়া হাস্যকর তবে এক কোটিতে একজন মাত্র। অথচ এইসব ঘিরে কী দুর্ভাবনাই না ছিল আমার ছেলেবেলায়!

আমি বাল্যকালের দুশ্চিন্তার কথা এখনো মনে পড়ে। তবে বড়দের বেলায়ও অনেক সময় হাস্যকর ভয়-ভীতি বা দুশ্চিন্তা জাগে। আপনি বা আমি গভীরভাবে চিন্তা করে দেখে নিতে পারি আমাদের দুশ্চিন্তার সত্যিই কোন কারণ আছে কিনা? অথবা সেরকম ঘটনা আদৌ আমাদের জীবনে ঘটতে পারে কিনা। তবে বিপদ--বিপদই আর মানুষের জীবনটাই বিপদসঙ্কুল।

মনে রাখতে হবে যে, বিপদকে ভয় না করে মোকাবেলা করাই প্রতিটি মানুষের ধর্ম।  



সেই কবেকার ছেলেবেলায় পূজো

তাপস বড়ুয়া

 

প্রবীরদা,                    

আমাদের বড়ুয়া পাড়ার পাশেই ছিলো আমাদের পাড়ার দশগুণ বড় সমৃদ্ধ হিন্দুপাড়া।

বাড়িগুলো ছিলো বড় বড়।হিন্দুপাড়ার সবাই আমাদের পাড়ার প্রাইমারি স্কুলে পড়তে

আসতো। প্রাইমারি শেষ করার পর সবাই ক্ষেতের মাঝখানের রাস্তা পেরিয়ে দোহাজারীর

মুসলিম পাড়ার মাঝখান দিয়ে প্রাই বিশ মিনিটের রাস্তা হেঁটে দোহাজারী হাইস্কুলে

পড়তে যেতাম।ক্ষেতের মাঝখানের রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় অথবা মুসলিম পাড়ার

ভিতর দিয়ে যাওয়ার সময় কিছু বখাটে ছেলে মেয়েদেরকে উত্ত্যক্ত করতো বলে প্রতিদিন

আমরা বড়ুয়াপাড়া এবং হিন্দুপাড়ার ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে দোহাজারী হাইস্কুলে যেতাম।

আর আমাদের বড়ুয়াপাড়া আর হিন্দুপাড়ার মাঝখানে প্রায় পনেরটি ঘরের ছোট্ট মুসলিমপাড়া ছিলো যাদের চরিত্রে অনান্য মুসলিমদের মতো কোন উগ্রতা ছিলো না।বিশেষ করে আমাদের পাশাপাশি তিন পাড়ার মাঝে এত গভীর সম্প্রিতি ছিলো যে, যে কোন ধর্মীয় পালা-পার্বনে আমরা এক প্রাণ এক সত্তা হয়ে ভীষণ আনন্দ করতাম।

তখন আমাদের মাঝে ধর্মীয় কোন পরিচয় থাকতো না।সবাই আমরা প্রাণের বন্ধু, আত্মার

আত্মীয় হয়ে যেতাম।বছরের সবচেয়ে আমাদের বড় আনন্দ ছিলো দুর্গাপূজা।বলতে গেলে

পূজোর শুরু থেকে বিসর্জন পর্যন্ত পূজোমন্ডপ আর বন্ধুর বাড়িতেই কাটিয়ে দিতাম।

হিন্দুপাড়ায় মোট চারটা দেবীমূর্তি তৈরি হতো।বিকেল থেকে একটু একটু পূজারী আর দর্শনার্থীদের আগমন ,সন্ধ্যা থেকে ঢাকের আওয়াজের সাথে আরতি।রাত যত বাড়বে পূজারী আর দর্শনার্থীদের ভিড় তত বাড়তে থাকে তেমনি ঢাকের আওয়াজও বেড়ে যায়।আরতির  সাথে আমরা বন্ধুরা আরতির ঢঙে নাচ শুরু করে দিতাম।একই গ্রামে চারটা মন্ডপ বলে

কিছুক্ষণ এই মন্ডপ কিছুক্ষণ ওই মন্ডপে ছুটে বেড়াতাম।রাত যত গভীর হবে মজাটা

আরো জমে। তখন কিছু রসিক মানুষ বেশ মজাদার সাজ-পোশাক পরে ঢাকের তালে

তালে এমন অদ্ভুত অদ্ভুত নাচ আর অভিনয় করে দেখায় হাসতে হাসতে পেটব্যথা

করে ছাড়ে।

পূজোর সময় আর একটা আনন্দ আমাদের বুকের মাঝে আলোড়ন তোলে।ক্লাস এইট বা নাইনে উঠার পর গলার স্বরটা একটু বদলে যায়।কোমল গোফগুলো উঁকি

মারতে শুরু করে। সেই বয়সটা আর সময়টা বড় বিপদজনক।যাকে এক পলক

দেখি তাকেই ভালো লেগে যায়। "ভালোলাগে" কথাটা বলতে না পেরে আরো অবস্থা

কাহিল।সেই মেয়েটা হতে পারে ক্লাসমেইট, হয়তোবা বন্ধুর বোন অথবা দিদিদের

বান্ধবী।পূজোতে যখন ভালোলাগা মেয়েগুলো সেজে আসে, মনে হয় এক একজন

যেন প্রতিমা! দেখে কি যে ভালো লাগে আর বলতে না পারা কথাগুলো ঢাকের

আওয়াজের মতো বুকে বাজে।তাই পূজো মানে আনন্দ,পূজো মানে বন্ধুত্ব,পূজো

মানে কাউকে ভালোলাগা, পূজো মানে না পাওয়ার বেদনা।পূজো মানে কারোর জন্যে

অপেক্ষা। পূজোর শেষে আমরা সবাই একা হয়ে আর একটা পূজোর জন্যে উন্মুক্ত হয়ে

অপেক্ষা করি।আপনার পূজোর ছড়াটা পড়ে আমার বুকের অনেক গভীর থেকে পূজোর

স্মৃতিগুলো ভেসে উঠলো।প্রবীরদা আপনার এই ছড়াটা বড় মর্মস্পর্শী।পড়ার শেষে বুঁদ

হয়েছিলাম অনেকক্ষণ।অজান্তে চোখের জল গড়িয়ে পড়লো, সেই সব বন্ধু, সেই সব স্মৃতি

আর কি ফিরে পাবো?

 

"১৯৭১, মার্চ মাস।যুদ্ধ শুরু হলো।অনেক হিন্দু পরিবার আমাদের পাড়ায় আশ্রয় নিলো। আমাদের বাড়িতে চার পরিবার আশ্রয় নিলো।যারা ভারতে শরণার্থী হয়ে চলে যেতে চেয়েছে।

তারা গ্রাম ছেড়ে চলে যাচ্ছে।আজকে খবর আসছে যে অমুক চলে যাচ্ছে, দৌড়ে যেতাম দেখা করতে।কান্নায় ভেসে জড়িয়ে ধরে একজন একজনকে বলতাম যুদ্ধ শেষ হলে আবার দেখা হবে।এমনি করে বন্ধুরা, ভালোলাগা মেয়েগুলো চোখের আড়াল থেকে দূরে সরে যেতে লাগলো।সবচেয়ে বড় আঘাতটা এলো জুন মাসের দিকে।রাজাকার আর পাকি আর্মিরা মাইকে

ঘোষণা দিয়ে জানালো যে, যেসব হিন্দুরা গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে তারা নির্ভয়ে বাড়িতে

ফিরে আসতে পারে।তাদের কোন ক্ষতি করা হবে না।এই বিশ্বাসে অনেকেই সেই রাতে

গ্রামে ফিরে আসে।এই সুযোগে তারপর দিন ভোরে পাকি আর রাজাকাররা হিন্দু গ্রামটার

প্রতিটি বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিয়ে নির্বিচারে গুলি করে মানুষ মেরেছে তবে কোন

জোয়ানকে পায়নি। যারা মরেছেন ২২ জনের মতো, সবাই বয়স্ক দৌড়ে পালাতে পারেননি।

আর মেয়েরা সবাই আমাদের গ্রামের আশ্রমে আশ্রয় নিয়েছিলো।পাকিরা আমাদের গ্রামেও

হামলা দিয়ে দুইটা বাড়িতে আগুন দিয়ে বিশাল আশ্রমটা দেখে অবাক হয়ে কৌ্তূহলে

আশ্রমে ঢুকে পড়ে। সেখানে সব মেয়েদেরকে দেখে ওরা উল্লাসে ফেটে পড়ে কিন্ত আমার

মামাত বোনের ক্লাসমেইট বিহারীর ছেলেটা যে পাকিদের সাথে ছিলো সে আমার মামাতো

বোনকে দেখে অবাক হয়ে যায়! মামাত বোনটা বললো, যুদ্ধে শহর থেকে পালিয়ে

গ্রামে এসেছি। এরা সবাই আমার আত্মীয় ও গ্রামবাসী।তুমি আমাদেরকে রক্ষা করো।এরপর বিহারী ছেলেটা পাকিদেরকে বুঝিয়ে গ্রাম থেকে ক্যাম্পে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।এতগুলো মেয়ে দেখার পর পাকিরা আবার ফিরে আসতে পারে ভেবে তার পরদিনই আমাদের পরিবারের মা বোনসহ গ্রামের যুবতী আর হিন্দুপাড়ার অল্প বয়সী মেয়ে,মা,বউ সবাই আমাদের গ্রামের পূর্বদিকের গভীর পাহাড় পেরিয়ে ৮ মাইল পর সমৃদ্ধ নামে এক গ্রাম আছে এবং মুক্তিযুদ্ধের ক্যাম্পও আছে। সেখানে নিরাপদ বলে চলে গেলো।এরপর আমাদের গ্রাম,হিন্দুগ্রাম সব বিরান ভূমিতে পরিণত হলো।

পোষা কুকুর বেড়ালগুলো প্রভুহারা হয়ে খাবার না পেয়ে অর্ধকঙ্কাল হয়ে প্রভুর

অপেক্ষায় দিন কাটাতে লাগলো আমরা যেমন চলে যাওয়ার বন্ধুদের অপেক্ষায়

দিন কাটাচ্ছি।এমনি করে দেশ স্বধীন হলো।ফিরে এলো কিছু পরিবার কিন্তু বেশির ভাগই

রয়ে গেলো ভারতে।আপনার এই ছড়াটা পড়ে আজকে সবার কথা মনে পড়ছে।

স্মৃতিগুলো মনে পড়ে বুকের ভিতর কান্নার অঝোর ধারার বৃষ্টি ঝরছে।আজ

কর্মসূত্রে, রাজনৈতিক কারণে, ভাগ্যচক্রে আমরা এদিক সেদিক ছড়িয়ে পড়েছি।

আজকের এই শারদীয় দুর্গোৎসবে সেই কৈশোর জীবনের আমার হারিয়ে যাওয়া

প্রাণের বন্ধুদের, ভালোলাগা সেই সব কিশোরীদের আমার প্রাণঢালা শারদীয়

শুভেচ্ছা জানাই।

আপনার ছড়াটা আবার আমাকে অনেক কিছু মনে করিয়ে দিলো, অনেক কিছু

ফিরিয়ে দিলো এ জন্যে আপনাকে বিশেষ ধন্যবাদ এর সাথে রইলো আন্তরিক

শারদীয় শুভেচ্ছা।

তাপস

 


বাবাকে মনে পড়ছে

তাপস বড়ুয়া

 

২০০৬, ২রা অক্টোবর রাত। দেশ থেকে ছোট বোনের টেলিফোন, বাবার অবস্থা ভালো না।

হ্যাঁ, আজ দুই সপ্তাহ ধরে বাবা হাসপাতালে। দীর্ঘবছর ধরে ডাইয়াবেটিক্সের সাথে যুদ্ধ করে  ৭২ বছর বয়সে হাসপাতালে শয্যাশায়ী। ছোট বোনকে বললাম, আমি জেগে আছি। কখন কি  অবস্থা হয় আমাকে জানাবি। টেলিফোন সেটটা বালিশের পাশে রেখে চোখ বুজে শুয়ে শুয়ে  বাবার কথা ভাবছিলাম। কলেজ জীবন শেষ করার পর গ্রাম ছেড়ে হোস্টেল জীবন, এরপর  চাকরী জীবন এবং  কর্মসূত্রে প্রবাসে।  আর গ্রামে ফেরা  হলোনা। গল্প করে করে বাবার  সাথে রাতের খাওয়াটা আমার বড় প্রিয় সময় ছিলো। আরো কত স্মৃতি, এ সব ভাবতে  ভাবতে উষ্ণ চোখের জল গড়িয়ে পড়ে বালিশটা ভিজে  গেলো। হটা করে টেলিফোনের আওয়াজে সম্বিত ফিরে  পেলাম।  ভয়ে ভয়ে টেলিফোনটা কানে দিয়ে বললাম, কে তন্দ্রা।

আমার ছোট বোন বললো, বাবা অস্ফুট স্বরে তোমার নাম ধরে ডাকছে। টেলিফোনটা কানে দিচ্ছি। কথা সেরে নাও। বোনটা কান্নায়    ভেঙ্গে গিয়ে বললো, হয়তোবা চলে যাওয়ার সময় হয়েছে। আমি টেলিফোনটা কানে চেপে ধরে বাবা বাবা বলে ডাকলাম। ওদিক থেকে কোন সাড়া পাচ্ছিলাম না। বোনটা জ়ানালো বাবা ঠিকই ঠোট নাড়ছে। কিন্তু কোন স্বর বের হচ্ছিল না। আমি কেঁদে কেঁদে বললাম, বাবা তুমি এখন যেয়ো না। তুমি সুস্থ  হয়ে উঠবে।  আমি সহসা  দেশে যাবো আর এক সাথে বসে গল্প করে করে রাতের ভাত খাবো। বাবা তুমি এখন যেয়ো না।

কিন্তু আমি বাবার দিক থেকে কোন সাড়া পেলাম না। এরপর আমার বো নটা জানালো  বাবার নিঃশ্বাস আছে ঠিকই কিন্তু আর কোন স্বর বের হচ্ছে না। দাদা তোমার ওখানে অনেক রাত এখন তুমি শুয়ে পড়ো। আমি জানালাম যে আমি জেগে আছি। কিছু হলে আমাকে জানাবি। রাত তখন আড়াইটা। বিছানায় জগে থাকতে থাকতে কখন ঘুমিয়ে পড়লাম টের পাইনি। আবার ক্রিন ক্রিন আওয়াজে ঘুম ভেংগে গেলো। ধড়ফড় করে টেলিফোনটা হাতে নিলাম। না টেলিফোন বাজেনি। বেজেছে ঘড়ির এলার্মটা। তখন ভোর পৌনে চারটা। মনে পড়লো আজ অফিস  ট্যুর, ভোর সাড়ে চারটার ট্রেন ধরে য়োকোহামা যেতে  হবে। যাক মনে মনে স্বস্তি পেলাম যে হয়তো বাবা ঘুমিয়ে আছে। ভোর বেলার  ট্রেন। যাত্রী তত নেই। ট্রেনের মৃদু দুলুনিতে  আর সারারাত মানসিক ধকলে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি টের পাইনি। হঠা মোবাইলের আওয়াজে ঘুম ভেঙ্গে গেলো। নাম্বারট দেখে বুকটা   ধক করে উঠলো। ট্রেনে এনাউন্স করছে আর কিছুক্ষণের মধ্যে নিশিনিপ্পোরিতে পৌঁছুবে। মোবাইলটা আস্তে করে কানে লাগিয়ে বললাম আমি তাপু বলছি। ওপার থেকে ফোঁপানো কান্নার আওয়াজ ছাড়া আর কোন কথা ছিলো না।  বাষ্পরুদ্ধ স্বরে বললাম, বাবা কি চলে গেছে? বোনটা   ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে জানালো, বাবা আর নেই।

নিশিনিপ্পোরিতে ট্রেনের   দরজা বন্ধ হওয়ার আগে একছুটে  প্লাটফর্মে বের হয়ে  এলাম।  অত ভোরে  প্লাটফর্মে উঠার আর যারা চলে যাওয়ার পর খালি হয়ে গেলো।  বাইরের  শূন্যতাটা  আমাকে পুরো গ্রাস করে ফেললো। এক মুহূর্তের জন্যে ভুলে গেলাম   আমি কে, কেনই বা শূন্য প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছি?

ডান হাতে ঝুলন্ত মোবাইলটা আমাকে বাস্তবে ফিরিয়ে দিল। মোবাইলটা যখন কানে পাতলাম, শুনি আমার বোন সেই তখন থেকেই ফুঁপিয়ে কাঁদছে। আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। অনেক অনেক বছর ধরে বুকের মাঝে জমে থাকা বাবাকে  ঘিরে আনন্দ, সুখ, অভিমান সব স্মৃতিগুলো কান্না হয়ে  প্রথমে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে, পরে গুমড়ে গুমড়ে  বেরিয়ে আসতে থাকলে  শূন্য প্লাটফর্মে নুইয়ে পড়লাম।

আজ ৩রা অক্টোবর২০১০। বাবার চতুর্থ মৃত্যু বার্ষিকী।

নতুনদেশে আপনার উপন্যাসসম অতলান্ত পিতৃস্মৃতি পড়ে হারানো বাবাকে খুব বেশি মনে পড়ছে।



Editor : Probir Bikash Sarker
Powerd by Manchitro Publishers, 2010 Copyright © All Rights Reserved.