কথায় বলে চাঁদেও চীনারা আছে। এমন একদিন আসবে বিশ্বের এমন কোনো দেশ বা অঞ্চল খুঁজে পাওয়া যাবে না  যেখানে বাঙালি নেই। নানা কাজের উদ্দেশ্যেই বাঙালিরা শতবর্ষ ধরে বহির্বিশ্বে যাতায়াত করছেন। কুসংস্কারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সমুদ্রের কালাপানি অতিক্রম করে ভারতবর্ষের প্রথম বাঙালি রাজা রামমোহন রায় বিলেত গিয়েছিলেন। সেইধারা ধরে কতজন বাঙালি এ পর্যন্ত বিদেশ গিয়েছেন সেই ইতিহাস কেউ লিখেছেন কিনা জানা নেই।

কতখানি সত্যি জানি না, শোনা যায় বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলের অন্যতম আবদুর রাজ্জাকের মাধ্যমে আদম ব্যবসার সূচনা হয়েছিল। কায়িক শ্রমিক হিসেবে প্রথম দলটি যায় ইরাকে। তারপর জিয়া ও এরশাদের আমলে মহামারি আকারে আদম ব্যবসা সরকারি-বেসরকারিভাবে ফুলে-ফেঁপে ওঠে। মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোতে হাজার হাজার বাঙালি শ্রমিক হিসেবে যেতে থাকে। এরশাদের আমলে এশিয়ার কতিপয় ধনী দেশে শ্রমিক ও ছাত্র হিসেবে তর“ণরা বেসরকারি আদম ব্যাপারীর মাধ্যমে পদার্পণ করে। জাপান তার অন্যতম একটি দেশ। আশির দশকে জাপানে প্রায় ৩০ হাজার বাঙালি ছিল যাদের অধিকাংশই শ্রমিক। বর্তমানে এর অর্ধেক আছে কি নেই।

আদিযুগ থেকেই মানুষ স্থানবদলের সঙ্গে-সঙ্গে তার নিজস্ব চিন্তা-চেতনা এবং সংস্কৃতিকে সঙ্গে করে নিয়ে গেছে। তার প্রতিফলন ঘটেছে নতুন স্থানে গিয়ে তার প্রয়োগ ও কর্মকান্ডের মধ্যে। ফলে ব্যাপক সংমিশ্রণ যেমন ঘটেছে একাধিক চিন্তা-ভাবনা ও সংস্কৃতির মধ্যে তেমনি সমৃদ্ধ হয়েছে জাতি, গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়। যে কারণে মানব জাতির সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য চিরকালই আকর্ষণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ। গুরুত্বের কারণ, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং নতুন জ্ঞানাহরণ যা কাজে লাগিয়ে আজকের বিশ্বের ধনী দেশগুলো সুপ্রতিষ্ঠিত শতবর্ষ ধরেই। যে দেশ ও জাতি এই সুযোগটি কাজে লাগাতে পারেনি তারাই পিছিয়ে আছে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত কাজে লাগাতে না পারবে অনগ্রসর থাকতে বাধ্য। এইসব দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। রাজনৈতিকভাবে ধর্মের ধুয়া তোলে কিংবা ডিজিটাল প্রযুক্তির ধুম্রজাল সৃষ্টি করে বাংলাদেশের মৌলিক সমস্যার সমাধান বা জাতীয় উন্নয়ন কতখানি সম্ভব সে প্রশ্ন অবান্তর নয় ঠিকই কিন্তু দিন বদলের স্লোগান তখনই সফল হবে যখন যথার্থ পরিকল্পনা গ্রহণ ও সময়মতো পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন করা যাবে। বাংলাদেশ এখান থেকে এখনো বহুদূরে অবস্থিত বলেই প্রতীয়মান হয়। 

এই দূরত্ব বা বন্ধ্যাত্বকে দূর করতে পারেন মেধাবী প্রবাসীরা। এটা অনেক বছর ধরেই বলাবলি হচ্ছে।  কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় আজ পর্যন্ত কোনো সরকারপ্রধান বা রাজনীতিক এই বিষয়টিকে আমল দেননি। আরও পরিতাপের বিষয় হচ্ছে যে, আজ পর্যন্ত কোনো সরকারপ্রধানই প্রবাসীদেরকে “ধন্যবাদ” জ্ঞাপন করার মতো সাধারণ জ্ঞানের পরিচয়টুকুও দিতে পারেননি! সরকার যা করেছে প্রবাসীদের জন্য সর্বসাকুল্যে একটি প্রবাসী মন্ত্রণালয়--জন্মলগ্ন থেকেই অব্যবস্থা আর দুর্নীতি যার ভূষণ। অথচ ২০০৯ সালের জরিপ পর্যন্ত জানা যায় যে, বিদেশে অভিবাসী বাংলাদেশী নাগরিকের সংখ্যা সরকারিভাবে ষাট লাধিক বেসরকারি হিসেবমতে ৯০ ল।  বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক নবেম্বর ২০০৯ তারিখে জানাচ্ছে যে, মাসিক রেমিটেন্স এই প্রথমবারের মতো প্রায় এক বিলিয়ন ইউএস ডলারে (৯.৭ বিলিয়ন) উন্নীত হয়েছে। যা জিডিপি বা জাতীয় আয়ের ১০% এবং রপ্তানি খাতে সর্বোচ্চ দ্বিতীয় স্থান অধিকারী। এই যে বিপুল পরিমাণ অর্থ কোন্ খাতে, কিভাবে লগ্নি বা ব্যবহৃত হচ্ছে তার কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি আজ পর্যন্ত।

হাড় জল করা পরিশ্রমে অর্জিত প্রবাসীদের এই অর্থ জাতির সার্বিক উন্নয়নে বিরাট অবদান সন্দেহ নেই তার বিনিময়ে প্রবাসীরা যা চান তা হল: মাতৃভূমি যেন বিশ্বের অন্যান্য মর্যাদাসম্পন্ন ধনী রাষ্ট্রগুলোর মতো মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে, সমাজে নিরাপত্তা বজায় রাখা যায়, নতুন প্রজন্ম শিক্ষা-দীক্ষায় সুনাগরিক হয়ে গড়ে ওঠে। তাহলে আজন্ম-অপরিচিত বিদেশ-বিভুঁইয়ে এই হাড়ভাঙা পরিশ্রম, জাতিবৈষম্য, অযত্ন-অবহেলাসহ নানাবিধ সমস্যার কিছুটা লাঘব হত, হত ভবিষ্যতের জন্য ফলপ্রসূ। কিন্তু প্রতিদিন যেভাবে আমরা পত্রপত্রিকার পৃষ্ঠায় বিদেশে প্রবাসী শ্রমিকদের লাঞ্ছনা, যন্ত্রণা, প্রতারণা এবং প্রবাস থেকে স্বদেশে প্রত্যাগত বা সফররত অবস্থায় তাঁদের নিরাপত্তাহীনতা, হয়রানি এবং অবহেলার সংবাদ পড়ি তাতে মানসিক পীড়া এবং হতাশাবোধ না করে উপায় থাকে না।

অপার সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশ। পরবর্তী উদীয়মান ১১টি (Next eleven) দেশের মধ্যে ৫ম দেশটি বাংলাদেশ বলে বলাবলি হচ্ছে। তার লক্ষণ আশাব্যঞ্জক। তার একটিমাত্র কারণ সস্তা শ্রমমূল্য। যেহেতু বিদেশী কোম্পানিগুলো চীন, ভিয়েতনাম, ভারত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং প্রভৃতি দেশে এতদিন পর্যন্ত সস্তা শ্রমমূল্যে পণ্যসামগ্রী উৎপাদনের লক্ষ্যে বিনিয়োগ করেছে এখন সেসব দেশে শ্রমমজুরি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে তাই দরিদ্র বাংলাদেশকে নজরে আনা ছাড়া গত্যন্তর নেই। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো পর্যন্ত বিদেশী বিনিয়োগের অনুকুল সুযোগ ও পরিবেশ সৃষ্টি করতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ পর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং এনার্জি সরবরাহহীনতার কারণে। অবশ্য এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোও এরকমই ছিল বিদেশী বিনিয়োগপূর্ব পর্যন্ত। ৭০ থেকে ৯০ দশক পর্যন্ত জাপান এশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার অনুন্নত দেশগুলোর জন্য ব্যাপক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করে দ্বিপাক্ষিক স্বার্থে। বিপুল পরিমাণ অবকাঠামোগত এবং এনার্জি-আহরণ ক্ষেত্রে অর্থসাহায্য বরাদ্দ করে ওডিএ (ODA) এর অধীনে। তার পরেই জাপানি কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ করা শুরু করে। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে জাপান থেকে সবচেয়ে বেশি অর্থসাহায্য পেয়েছে জন্মলগ্ন থেকেই কিন্তু কতখানি উন্নয়ন হয়েছে তা আমরা সকলেই জানি। আত্মসাৎ, দুর্নীতি এবং অবহেলার কারণে প্রদত্ত অর্থ প্রত্যাহারের সংবাদও আমরা সংবাদপত্রে পড়েছি। এটা জাতির জন্য সত্যি দুর্ভাগ্য যে, এশিয়ার একদা চরম পশ্চাৎপদ দেশগুলো যেভাবে জাপানকে ব্যবহার করে দাঁড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ তা পারেনি জাপান-বাংলা শতবর্ষের উজ্জ্বল রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক বিনিময় সম্পর্ক বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও। আমাদের রাজনীতিক, কূটনীতিক, শিক্ষক, ব্যবসায়ীদের অজ্ঞতার কারণে। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুও জাপানকে অনেকখানি প্রভাবিত করেছিল।

যাক সে ইতিহাস। বর্তমান প্রোপটে আমরা যা শিক্ষালাভ করতে পারি তা হল: মেধাবী প্রবাসীদের কীভাবে রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়নে কাজে লাগানো যায়। উপরে বর্ণিত দেশগুলো এখন অনেক উন্নত রাষ্ট্র। সেখান থেকে বিনিয়োগকারীরা পালাচ্ছে। কিন্তু দেশগুলো ধ্বসে পড়ছে না। তার কারণ শিক্ষার হার বৃদ্ধি, প্রবাসীদের স্বদেশ প্রত্যাগমন এবং বাণিজ্য ক্ষেত্রে বিনিয়োগ। প্রতিবেশী ভারতের দিকে তাকালেই তা সুস্পষ্ট হবে। আমেরিকার সিলিকনভ্যালিতে ৮০ এর দশকে  আইটি (IT) খাতে কাজ করত অসংখ্য ভারতীয় অভিবাসী তরুণ প্রজন্মের ছাত্র ও নতুন উদ্যোক্তা। আমেরিকা সফরকালে প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন তাঁদেরকে সেখানে কাজ করতে দেখে! স্বদেশে ফিরে গিয়ে কাল বিলম্ব না করে আইটি খাতে বিপ্লব ঘটানোর জন্য মেধাবী প্রবাসীদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তাঁর বদান্যতায় ভারতে প্রথম সাধারণ্যে কম্পিউটার প্রবেশ করে। শত বছর প্রাচীন অচলায়তন বহির্বিশ্বে শিক্ষালদ্ধ রাজীব গান্ধীর দ্বারা সচল হয়েছিল বলেই কত দ্রুত পাল্টে গিয়েছে ভারত ভাবলে আশ্চর্য হতেই হয়!

জাপানের কথাই যদি বলি, বিচিত্র ব্যবহার্য প্রযুক্তির স্বর্গ হচ্ছে এদেশ। কমপে আজকে ১০ হাজার বাংলাদেশী এদেশের নানা রকম হালকা ও ভারীশিল্প কলকারখানা, সার্ভিস খাতে কাজ করতে গিয়ে হয়ে উঠেছেন কারিগর, প্রযুক্তিবিদ, ম্যানেজার এবং ব্যবসা বিষয়ে অভিজ্ঞ যাদের ছাড়া আজকে প্রতিষ্ঠান চলে না। অনেক ক্ষেত্রে জাপানিদের চেয়েও অগ্রসর, কর্মঠ, অভিনিবেশী বাঙালি শ্রমিকরা। তাঁদের অমূল্য মেধা ও ব্যবহারিক জ্ঞান হারিয়ে যাবে বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে-সঙ্গে। বাংলাদেশের সরকার এইসব প্রবাসীদেরকে দেশের সুদূরপ্রসারী উন্নতির কথা বিবেচনা করে সরকারি পরিচালনা পরিষদ থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং দ্বিপাকি ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নিয়োগ করতে পারে। বাংলাদেশ তাঁদেরকে যে শিক্ষা দিতে পারেনি, বহু বছরের ব্যবধানে বিদেশে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অর্জিত সেই শিক্ষা, জ্ঞান এবং নোহাউ যত শীঘ্র সরকার প্রয়োগ করবে ততই বাংলাদেশের শ্রীবৃদ্ধি ও সার্বিক চালচিত্র বদলে যেতে বাধ্য। এটা বিজ্ঞ জাপানিরাই বলছেন।

এটা সত্য যে, বিদেশী ব্যবসায়ীরা আসবে এদেশে একটা সময়ের জন্য, সুদূরপ্রসারী কোনো চিন্তা নিয়ে কেউ আসবে না। তারপর কী হবে? সেই অনিশ্চিৎ ভবিষ্যৎকে সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের রূপ দিতে পারে একমাত্র মেধাবী প্রবাসীরাই।

 

 


Editor : Probir Bikash Sarker
Powerd by Manchitro Publishers, 2010 Copyright © All Rights Reserved.